বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে ওসমানী যা করেছিলেন তা বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়, যার মাধ্যমে দেশের বহুদলীয় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বাতিল করে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা—বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল—প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিলটি সংসদে ওঠার মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই পাস হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে—কেউ একে দেখেন তৎকালীন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার একটি চেষ্টা হিসেবে, কেউবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ার একটি ঘটনা হিসেবে।
এই ঐতিহাসিক দিনেই একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী—মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, তখনকার বেসামরিক বিমান এবং ডাক ও তার-টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। তাঁর তৎকালীন একান্ত সহকারী শাহনূর চৌধুরীর জবানিতে জানা যায় সেই দিনের ঘটনা, যা তাঁকে চিনিয়েছিল একজন ভিন্নধর্মী রাজনীতিক হিসেবে।
(এই নিবন্ধটি আমাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের একটি অংশ। সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এখানে।)
বৃষ্টিভেজা বিকেলে এক আকস্মিক সিদ্ধান্ত
বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে ওসমানী যা করেছিলেন শাহনূর চৌধুরীর বর্ণনা অনুযায়ী, বাকশাল বিল পাস হওয়ার দিনই, বেলা প্রায় সাড়ে তিনটায়, জেনারেল ওসমানী সংসদ সদস্যপদ এবং মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। স্বাভাবিক নিয়মে একজন মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে বাড়ি ফেরা যেত। কিন্তু ওসমানী তা করেননি। বৃষ্টিতে ভিজেই তিনি একটি রিকশা ডেকে বাসায় ফেরেন।
এরপর তিনি ফোন করেন তাঁর আত্মীয় ও তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা মুসলেহ উর রহমান ওসমানীকে, এবং জানান যে তাঁর আর থাকার সরকারি জায়গা নেই, কারণ তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। ছোট একটি গাড়িতে করে প্রায় কুড়িবার আসা-যাওয়া করে তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সরকারি বাসা থেকে সরানো হয়।

একদিনও সরকারি সুবিধা ভোগ করেননি
শাহনূর চৌধুরী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পদত্যাগের পর জেনারেল ওসমানী একদিনও সরকারি বাসভবনে থাকেননি—যদিও তাঁকে তা করতে কেউ নিষেধ করেনি, এবং বাড়ি ছাড়ার জন্য কোনো তাগাদাও ছিল না। দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের জন্য এত দ্রুত সব সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে দেওয়াটা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী।
শাহনূর চৌধুরীর ভাষায়, এই ঘটনাই ওসমানীর চরিত্রের একটি বড় দিক তুলে ধরে—ক্ষমতা বা সুযোগ-সুবিধার প্রতি লোভহীনতা। ছোট ছোট এমন ঘটনার মধ্য দিয়েই তিনি মনে করেন মানুষ বুঝতে পারবে ওসমানী আসলে কেমন মানুষ ছিলেন।
আরও পড়ুন : জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি?
কেন এই পদত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ
বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে ওসমানী যা করেছিলেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা পরিক্রমায় প্রমাণিত হয়েছে।একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের দিনেই একজন মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীর পদত্যাগ সেই সময়ের রাজনৈতিক আবহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। এটি দেখায় যে বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও ভিন্নমত ছিল, এবং সেই ভিন্নমত প্রকাশের ধরন ছিল নীরব অথচ স্পষ্ট—কোনো বিবৃতি নয়, বরং একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও তাৎক্ষণিক প্রস্থান।
(জেনারেল ওসমানীর নির্বাচনী লড়াই, সাদামাটা জীবনযাপন এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে আমাদের সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলোও পড়ুন।)
ভিডিওতে দেখুন: বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে ওসমানী যা করেছিলেন তার পুরো বর্ণনা শুনুন শাহনূর চৌধুরীর নিজের ভাষায়, নিচের ভিডিওতে।