লিয়াকত হোসেন খোকন
ভ্রমণ ও সংস্কৃতিবিষয়ক লেখক
সিনেমা শুধু গল্প বলে না, কখনো কখনো একটি সময়কেও ধরে রাখে। পর্দায় মানুষ, সমাজ, প্রেম, অভাব, স্বপ্ন আর বেদনার যে ছবি আমরা দেখি, তার পেছনে থাকেন এমন কিছু মানুষ, যাঁরা ক্যামেরাকে নিছক একটি যন্ত্র হিসেবে দেখেননি—দেখেছেন জীবনকে তুলে ধরার এক অসাধারণ মাধ্যম হিসেবে।
সুভাষ দত্ত ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারণ করলে একই সঙ্গে মনে পড়ে একজন পরিচালক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং শিল্পীর কথা। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি সম্ভবত অন্য কোথাও—তিনি ছিলেন মানুষের গল্প বলার একজন সংবেদনশীল কারিগর।
পোস্টারের রঙ-তুলি থেকে রুপালি পর্দা, অভিনেতা থেকে পরিচালক—সুভাষ দত্তের দীর্ঘ পথচলা ছিল একেবারেই আলাদা ধরনের।
পোস্টারের রঙ থেকে চলচ্চিত্রের জগতে
১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরে জন্মেছিলেন সুভাষ দত্ত। তখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীন।
চলচ্চিত্রে তাঁর শুরুটা কিন্তু পরিচালক হিসেবে নয়। তিনি কাজ করতেন বাণিজ্যিক চিত্রশিল্পী ও সিনেমার পোস্টার ডিজাইনার হিসেবে। সিনেমার পোস্টার আঁকতে আঁকতেই তাঁর পরিচয় ঘটে চলচ্চিত্রের ভেতরের জগতের সঙ্গে।
পরবর্তীতে তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশামের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময়টিই তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের ভিত তৈরি করে দেয়।
একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর চোখ তখন শুধু ছবির বাইরের সৌন্দর্য দেখছিল না; তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন কীভাবে একটি গল্পকে দৃশ্যের পর দৃশ্যে জীবন্ত করে তুলতে হয়।
আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে একদিন ক্যামেরার পেছনে নিয়ে যায়।
অভিনেতা সুভাষ দত্ত
ক্যামেরার পেছনে যাওয়ার আগে এবং পরেও সুভাষ দত্ত অভিনয় করেছেন অসংখ্য চলচ্চিত্রে। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল স্বাভাবিকতা, সংযম এবং চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা।
১৯৫৯ সালের ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। এরপর ‘হারানো দিন’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘সুতরাং’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘বিনিময়’, ‘ডুমুরের ফুল’ ও **‘নাজমা’**সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন।
তাঁকে শুধু পরিচালক হিসেবে মনে রাখলে তাই তাঁর শিল্পীসত্তার একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
তিনি ছিলেন একই সঙ্গে ক্যামেরার সামনে এবং পেছনে থাকা মানুষ।
‘সুতরাং’: যে ছবিতে পরিচালক সুভাষ দত্তের জন্ম
১৯৬৪ সাল।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তখনও নিজের ভাষা ও নিজস্ব গল্প বলার ধরন খুঁজে নিচ্ছে। সেই সময় সুভাষ দত্ত নির্মাণ করলেন ‘সুতরাং’।
এটি ছিল তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। আর প্রথম ছবিতেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন—সিনেমা বানানোর জন্য শুধু বড় বাজেট বা বিশাল আয়োজন দরকার হয় না; দরকার মানুষের জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকানোর ক্ষমতা।
‘সুতরাং’-এ উঠে এসেছিল সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পর্ক, আবেগ এবং সামাজিক বাস্তবতার গল্প। ছবিটির সাফল্য সুভাষ দত্তকে পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনেও ছবিটি স্বীকৃতি পায়।
আজ এত বছর পরও ‘সুতরাং’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। কারণ এটি শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল এক নতুন চলচ্চিত্র-ভাষার ইঙ্গিত।
জীবনকে দেখার নিজস্ব চোখ
সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে একটি বিষয় খুব সহজেই চোখে পড়ে—তিনি মানুষের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছেন।
মধ্যবিত্তের সংসার, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক বাস্তবতা, ভালোবাসা, বঞ্চনা—এসব তাঁর গল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
তাঁর সিনেমায় মানুষ খুব বেশি দূরের কেউ নয়।
সে আমাদের পাশের বাড়ির মানুষ। কখনো পরিবারের সদস্য, কখনো পরিচিত মুখ, কখনো বা নিজেরই কোনো না কোনো প্রতিচ্ছবি।
এই কারণেই তাঁর চলচ্চিত্রে আবেগ থাকলেও তা কৃত্রিম মনে হয় না। তাঁর চরিত্রগুলো কাগজে লেখা চরিত্র নয়—তারা যেন আমাদের চারপাশে হাঁটাচলা করা মানুষ।
‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’: যুদ্ধের ক্ষত ও মানুষের গল্প
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর অধ্যায়গুলোর একটি। সেই যুদ্ধকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরার দায়িত্বও সহজ ছিল না।
সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’—মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।
যুদ্ধকে শুধু বন্দুক, বিস্ফোরণ আর রণাঙ্গনের দৃশ্য দিয়ে দেখানো যায় না। যুদ্ধ মানুষের জীবনকে কীভাবে বদলে দেয়, পরিবারকে কীভাবে ভেঙে দেয়, মানুষের মনে কী ধরনের ক্ষত তৈরি করে—সেই মানবিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ।
সুভাষ দত্তের চলচ্চিত্রে সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
‘বসুন্ধরা’: জীবনের আরেক আয়না
১৯৭৭ সালে নির্মিত ‘বসুন্ধরা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর একটি। আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘তেজস্বী কন্যা’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে আবারও মানুষের জীবন ও সামাজিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুভাষ দত্তের পরিচালনায় সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের যে চেষ্টা দেখা যায়, সেটিও তাঁর সৃষ্টিশীলতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
তিনি গল্পকে শুধু পর্দায় স্থানান্তর করেননি; গল্পের ভেতরের মানুষগুলোকেও বোঝার চেষ্টা করেছেন।
আরও কিছু স্মরণীয় চলচ্চিত্র
দীর্ঘ পরিচালকজীবনে সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেছেন একাধিক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।
তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সুতরাং — ১৯৬৪
- কাগজের নৌকা — ১৯৬৬
- আয়না ও অবশিষ্ট — ১৯৬৮
- অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী — ১৯৭২
- বসুন্ধরা — ১৯৭৭
- ডুমুরের ফুল — ১৯৭৮
- সোহাগ — ১৯৮২
- সবুজ সাথী — ১৯৮২
- আঁখিমিলন — ১৯৮৫
- স্বামী স্ত্রী — ১৯৮৭
- ও আমার ছেলে — ২০০৮
তাঁর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘ও আমার ছেলে’।
অভিনেতা হিসেবেও তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকা দীর্ঘ। ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘হারানো দিন’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘সুতরাং’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’, ‘বিনিময়’, ‘ডুমুরের ফুল’ ও ‘নাজমা’ তাঁর অভিনয়জীবনের স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে।
একজন শিল্পীর স্বীকৃতি
চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সুভাষ দত্ত পেয়েছেন নানা সম্মাননা।
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৯ সালে একুশে পদক প্রদান করে।
তাঁর কাজ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতিও পেয়েছে।
তবে শিল্পীর জন্য পুরস্কার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় পুরস্কার হয়তো দর্শকের ভালোবাসা।
সুভাষ দত্ত সেই ভালোবাসা পেয়েছিলেন।
সেলুলয়েডে থেকে যাওয়া মানুষটি
২০১২ সালের ১৬ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন সুভাষ দত্ত।
একজন শিল্পীর জীবন শেষ হয়ে যায় তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি শেষ হয়ে যায় না।
একটি পুরোনো সিনেমার দৃশ্য হঠাৎ কোনো এক বিকেলে চোখে পড়ে। কোনো সংলাপ মনে পড়ে যায়। কোনো গান পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। তখন মনে হয়—মানুষটি কোথায় যেন এখনও আছেন।
সুভাষ দত্তও তেমনই একজন।
তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো রয়ে গেছে। তাঁর গল্পগুলো রয়ে গেছে। তাঁর আঁকা জীবনের ছবিগুলো রয়ে গেছে।
আর রয়ে গেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দলিল।
পোস্টারের ক্যানভাসে রঙ মেশানো সেই শিল্পী একদিন সেলুলয়েডের ক্যানভাসে মানুষের জীবন আঁকতে শুরু করেছিলেন।
তাঁর সেই আলপনা নিখুঁত ছিল কি না, সে বিচার সময় করবে।
কিন্তু একটি কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়—
সুভাষ দত্ত বাংলা চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে নিজের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করে গেছেন, যেখান থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সহজ নয়।
লেখা ভালো লাগলে লেখকের প্রতি আপনার ভালোবাসা ও সম্মান জানাতে পারেন।
সুভাষ দত্তকে নিয়ে একটি ইউটিউব শর্ট ভিডিও দেখুন