জেনারেল ওসমানী কখনো স্বজনপ্রীতি করেননি

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে নিয়ে নানা সময়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। তাঁর সামরিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান, মন্ত্রীত্ব, পদত্যাগ এবং ব্যক্তিজীবন নিয়ে বহু স্মৃতিচারণও প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁকে কাছ থেকে দেখা মানুষের বর্ণনায় ওসমানীর ব্যক্তিত্বের যে দিকটি বিশেষভাবে উঠে আসে, তা হলো—তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা বা স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকা একজন নীতিবান মানুষ ছিলেন।

জেনারেল ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন একান্ত সহকারী শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিচারণে এমনই একটি ছবি পাওয়া যায়।

২০২০ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় শাহনূর চৌধুরীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বদরুল হুসেইন বাবু। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের মার্চে তিনি জেনারেল ওসমানীর একান্ত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ফলে মন্ত্রী হিসেবে ওসমানীর ব্যক্তিজীবন ও কাজের পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছিল।

জেনারেল ওসমানীর কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে নীতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ

শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে জেনারেল ওসমানী ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং ন্যায়-নীতির প্রতি অবিচল একজন মানুষ। তাঁর কাছে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সুবিধার চেয়ে নীতি ও যোগ্যতার গুরুত্ব ছিল বেশি।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসন, রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো তখন গড়ে উঠছে। এমন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বা ব্যক্তিগত পরিচয়কে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে ওসমানীর চরিত্রের যে দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও জেনারেল ওসমানী কখনো স্বজনপ্রীতি করেননি। তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে সামনে রাখতেন না।

কাছ থেকে দেখা ওসমানী ছিলেন কঠোর নীতিবোধের মানুষ

কোনো একজন রাজনৈতিক বা সামরিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে শুধু তাঁর পদ বা জনপ্রিয়তা দেখলেই হয় না। তাঁকে কাছ থেকে যারা দেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।

শাহনূর চৌধুরী ছিলেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী, যিনি স্বাধীনতার পর ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন সময়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। তাই তাঁর স্মৃতিচারণে ওসমানীর ব্যক্তিগত আচরণ, জীবনযাপন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

শাহনূরের বর্ণনায় ওসমানীর মধ্যে যে বিষয়টি বারবার লক্ষ করা যায় তা হলো আত্মসম্মান, সরলতা এবং নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা।

এই বৈশিষ্ট্য তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও দেখা যায়।

নীতিগত কারণে মন্ত্রীত্ব ছেড়েছিলেন ওসমানী

জেনারেল ওসমানীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল মন্ত্রীসভা থেকে তাঁর পদত্যাগ।

বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরোধিতা করে তিনি মন্ত্রীত্ব ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কের অবসান ঘটান। এই ঘটনা শুধু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত নীতিবোধ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে ওসমানী এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি কোনো পদ আঁকড়ে থাকার জন্য নিজের নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেননি।

মন্ত্রীত্ব তাঁর কাছে ব্যক্তিগত মর্যাদা বা সুবিধা অর্জনের মাধ্যম ছিল না। নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হলে তিনি সেই পদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সরকারি বাড়ি ছাড়তেও দেরি করেননি

মন্ত্রীত্ব শেষ হওয়ার পর ওসমানীর জীবনযাপনের একটি ঘটনা তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক তুলে ধরে।

শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মন্ত্রীত্ব শেষ হওয়ার পর সরকারি বাসভবনে থাকার কোনো আগ্রহ তাঁর ছিল না। তিনি দ্রুত সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন।

ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত সুযোগ-সুবিধাকে নিজের অধিকার হিসেবে ধরে না রাখার এই মানসিকতা তাঁর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এ কারণেই ওসমানীর জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও আত্মসম্মানের বিষয়টিও সামনে আসে।

নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যবহার

শাহনূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে ওসমানীর নির্বাচনী জীবন সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি উঠে আসে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে ওসমানী সিলেট-৬ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং তিনি দল ও মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

শাহনূরের স্মৃতিতে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাগুলোও ওসমানীর ব্যক্তিগত সরলতা ও আত্মনির্ভরতার একটি দিক তুলে ধরে।

স্বজনপ্রীতির প্রশ্নে ওসমানীর চরিত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে আজ যখন নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, তখন শুধু তাঁর যুদ্ধকালীন ভূমিকা নয়, স্বাধীনতার পর তাঁর ব্যক্তিত্বও জানা প্রয়োজন।

একজন মানুষ ক্ষমতার কাছে থেকেও ক্ষমতার সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে কতটা গ্রহণ করেছেন—এটি তাঁর চরিত্র বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

শাহনূর চৌধুরীর মতো একজন ঘনিষ্ঠ সহকারীর স্মৃতিচারণ থেকে যে ওসমানীর ছবি পাওয়া যায়, সেখানে তিনি ছিলেন সাদাসিধে জীবনযাপনকারী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে দৃঢ় একজন মানুষ। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, জেনারেল ওসমানী কখনো স্বজনপ্রীতি করেননি।

তাঁর জীবনকে মূল্যায়ন করতে হলে তাই শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে তাঁকে দেখা যথেষ্ট নয়।

শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে জেনারেল ওসমানী

২০২০ সালে এডিনবরায় নেওয়া শাহনূর চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি ওসমানীর ব্যক্তিজীবনের এমন কিছু দিক সামনে আনে, যা সাধারণ জীবনী বা রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় সবসময় পাওয়া যায় না।

শাহনূর ছিলেন তাঁর মন্ত্রীত্বকালীন একান্ত সহকারী। ফলে তাঁর বক্তব্য মূলত একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞ ব্যক্তির স্মৃতিচারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই স্মৃতিগুলোর মধ্য দিয়ে যে ওসমানীকে দেখা যায়, তিনি ছিলেন ক্ষমতার চেয়ে নীতিকে বড় করে দেখা একজন মানুষ।

সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার দেখুন

জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন একান্ত সহকারী শাহনূর চৌধুরীর সঙ্গে ২০২০ সালে এডিনবরায় নেওয়া পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ওসমানীর ব্যক্তিজীবন, মন্ত্রীত্ব, পদত্যাগ, নির্বাচন ও নানা অজানা ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: বদরুল হুসেইন বাবু
সাক্ষাৎকারদাতা: শাহনূর চৌধুরী
স্থান: এডিনবরা, স্কটল্যান্ড
বছর: ২০২০

প্রিয় পাঠক, সাগরপারে নোঙর ফেলুন!
আপনার ইমেইল ঠিকানা দিন। নতুন লেখা প্রকাশ হলেই পৌঁছে যাবে আপনার ইনবক্সে।

আপনার ইমেইল আমরা সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করি। চাইলে যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।