১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন ছিলেন না।
এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত। জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কেউ বলেছেন প্রটোকলের বিষয়, কেউ বলেছেন তাঁর যাত্রাপথের সমস্যার কথা, আবার কেউ রাজনৈতিক বা সামরিক প্রেক্ষাপটের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হলেন শাহনূর চৌধুরী—স্বাধীনতার পর জেনারেল ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন একান্ত সহকারী।
২০২০ সালে এডিনবরায় শাহনূর চৌধুরীর সঙ্গে নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই প্রসঙ্গও উঠে আসে।
১৬ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানে ওসমানীর অনুপস্থিতি
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। সেই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং মিত্রবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।
কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী সেখানে ছিলেন না।
এই অনুপস্থিতি পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুধু একটি সূত্রের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। কারণ ঘটনাটি নিয়ে একাধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিবরণ রয়েছে।
শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে বিষয়টি
জেনারেল ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন একান্ত সহকারী শাহনূর চৌধুরী এই প্রশ্নের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭৩ সালের মার্চে তিনি ওসমানীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং তাঁর খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ পান।
শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিচারণে জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতির পেছনে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা তিনি ওসমানীর মুখে শুনেছেন—এমন দাবি তিনি করেননি।
বরং তাঁর স্মৃতিতে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে ওসমানীর সম্পর্ক ছিল ভালো এবং পারস্পরিক সম্মানের।
এই বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওসমানীর অনুপস্থিতিকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে যে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, শাহনূরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

প্রটোকলের প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জেনারেল ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন ছিলেন না এই প্রশ্নের ভিত্তিতে ওসমানীর অনুপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে প্রটোকলের বিষয়টি বহু আলোচনায় এসেছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সামরিক কমান্ড কাঠামো তৈরি হয়েছিল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মিত্রবাহিনীর পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে জেনারেল ওসমানীর অবস্থান কী হওয়া উচিত ছিল—তা নিয়ে সামরিক প্রটোকলের প্রশ্ন তৈরি হয়।
পরবর্তী বিভিন্ন বিবরণে ওসমানীর অবস্থান হিসেবে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তার মূল কথা ছিল—তিনি এমন কোনো অনুষ্ঠানে যেতে চাননি যেখানে তাঁর অবস্থান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে না।
অর্থাৎ বিষয়টি ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে সামরিক মর্যাদা ও প্রটোকলের প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি?
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কথাও এসেছে
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ওসমানীর যাতায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত হেলিকপ্টার প্রসঙ্গ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর ওসমানী ঢাকার দিকে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে ছিলেন এবং তাঁর ব্যবহৃত হেলিকপ্টার শত্রুপক্ষের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এই ঘটনাটি তাঁর ঢাকায় পৌঁছাতে না পারার অন্যতম ব্যাখ্যা হিসেবে বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে একমাত্র বা চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
শাহনূর চৌধুরী কি কোনো ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছিলেন?
এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ জেনারেল ওসমানীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি নিয়ে বহু বছর ধরে নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে।
শাহনূর চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ওসমানীর কাছ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী বা মুজিবনগর সরকারের কারও ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছেন—এমন কোনো স্মৃতি তাঁর নেই।
বরং তিনি ওসমানীকে মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে দেখেছেন।
শাহনূরের স্মৃতিতে ওসমানী নীতিগত বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করতেন।
এই জায়গাটিই তাঁর সাক্ষাৎকারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
তাহলে জেনারেল ওসমানী কেন ছিলেন না?
এই প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে দেওয়া সম্ভব নয়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে অন্তত কয়েকটি বিষয় সামনে আসে—
প্রথমত, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সামরিক কমান্ড ও প্রটোকল নিয়ে একটি বাস্তব প্রশ্ন ছিল।
দ্বিতীয়ত, ওসমানীর যাত্রাপথ ও হেলিকপ্টার নিয়ে সমস্যার বিবরণ পাওয়া যায়।
তৃতীয়ত, ওসমানীর অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বিতর্ক তৈরি হয়।
চতুর্থত, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারী শাহনূর চৌধুরীর স্মৃতিতে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা ওসমানীর কাছ থেকে শোনা যায়নি।
তাই বিষয়টিকে একটি মাত্র ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
ওসমানীর নিজের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জেনারেল ওসমানী নিজেও পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।
সেখানে সামরিক প্রটোকল, যৌথ কমান্ড এবং বাংলাদেশের তৎকালীন আন্তর্জাতিক অবস্থানের বিষয় উঠে আসে।
তাঁর বক্তব্যের মূল ভাব ছিল, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তাঁর ভূমিকা কী হবে এবং তাঁর সামরিক মর্যাদা কীভাবে প্রতিফলিত হবে—এই প্রশ্নটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অতএব, তাঁর অনুপস্থিতিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত অসন্তোষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের জটিল ঘটনাটিকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলতে পারে।
শাহনূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শাহনূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব এখানেই যে তিনি ছিলেন ওসমানীর খুব কাছের একজন সহকারী।
তবে তাঁর বক্তব্যও একটি স্মৃতিচারণমূলক প্রত্যক্ষ সূত্র হিসেবে দেখা উচিত।
ইতিহাসের কোনো বিতর্কিত ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রে একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞ ব্যক্তির স্মৃতি মূল্যবান হলেও, তার সঙ্গে অন্যান্য দলিল, বই ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মিলিয়ে দেখা জরুরি।
এই পদ্ধতিই ইতিহাসকে আরও নির্ভরযোগ্যভাবে বোঝার সুযোগ দেয়।
১৯৭১-এর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
জেনারেল ওসমানীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক হয়তো পুরোপুরি কখনো শেষ হবে না। কারণ ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের শেষ দিনগুলোর সামরিক কমান্ড, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী, আন্তর্জাতিক সামরিক প্রটোকল এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—এই ঘটনা জেনারেল ওসমানীর জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
আর শাহনূর চৌধুরীর মতো তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারীর স্মৃতিচারণ সেই অধ্যায়কে আরও একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
শাহনূর চৌধুরীর সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার
২০২০ সালে এডিনবরায় বদরুল হোসেন বাবুর নেওয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শাহনূর চৌধুরী জেনারেল এম এ জি ওসমানীর মন্ত্রীত্বকালীন জীবন, ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেছেন। জেনারেল ওসমানী আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন ছিলেন না এই বিষয়েও মুখ খুলেছেন শাহনূর চৌধুরী
নোট: এই লেখায় শাহনূর চৌধুরীর ২০২০ সালের সাক্ষাৎকারের স্মৃতিচারণকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়।
সাক্ষাৎকারদাতা: শাহনূর চৌধুরী
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: বদরুল হোসেন বাবু
স্থান: এডিনবরা, স্কটল্যান্ড
সময়কাল: ২০২০ সাল