জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি এই প্রশ্নের প্রায়ই উদ্রেক হয় তাঁর অনুরাগীদের মনে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। অথচ স্বাধীনতার মাত্র সাত বছর পর, ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি হেরে যান। প্রশ্ন ওঠে—দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বোচ্চ সামরিক নেতা কেন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হতে পারলেন না?
এই লেখায় আমরা তুলে ধরছি জেনারেল ওসমানীর তৎকালীন একান্ত সহকারী শাহনূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া ভেতরের গল্প, পাশাপাশি সেই নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
(এই নিবন্ধটি আমাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের একটি অংশ। সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এখানে।)
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট: একতরফা লড়াই
১৯৭৮ সালের নির্বাচনে মোট দশ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। প্রধান লড়াই হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী জিয়াউর রহমান এবং গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট-সমর্থিত প্রার্থী জেনারেল ওসমানীর মধ্যে। আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি বামপন্থী দল ওসমানীকে সমর্থন দিয়েছিল।
কিন্তু এই লড়াই ছিল অসম। জিয়াউর রহমান তখন একই সঙ্গে সেনাবাহিনী প্রধান, চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক—রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও প্রচারযন্ত্র তাঁর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ফলাফলে জিয়াউর রহমান প্রায় সাড়ে ছিয়াত্তর শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। বিরোধী রাজনৈতিক মহলে এই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল, বিশেষত ক্ষমতাসীন সামরিক শাসকের বিপক্ষে একজন অবসরপ্রাপ্ত, সম্পদহীন প্রার্থীর সমান সুযোগ ছিল কি না তা নিয়ে।
যে লড়াইটা টাকার অভাবেই কঠিন ছিল
শাহনূর চৌধুরীর ভাষ্যে উঠে আসে এক অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি দিক—অর্থের অভাব। জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি এর একটি কারন জেনারেল ওসমানী তখন রাজনৈতিক দলের কোনো বড় অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, আর বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার মতো ব্যবস্থাও তখন গড়ে ওঠেনি। নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে তিনি নিজের গ্রামের বাড়িতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় সব জমি বিক্রি করে দেন, শুধু ভিটেটুকু রেখে।
শাহনূর চৌধুরী তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে জমি বিক্রি করলে সেই জমি থেকে পাওয়া ধানের ভাগও তিনি আর পাবেন না। ওসমানীর জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত—”যা হওয়ার হবে।” তখন তাঁর একমাত্র নিয়মিত আয় ছিল সামরিক পেনশনের সামান্য অর্থ, আর তিনি বলতেন সেটুকুই তাঁর জন্য যথেষ্ট।
এই ঘটনা শুধু একটি নির্বাচনী বাজেটের গল্প নয়—এটি সেই সময়ের রাজনীতিতে অর্থ ও ক্ষমতার সমীকরণের একটি ছবি, যেখানে ব্যক্তিগত সততা থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ছাড়া নির্বাচনে জেতা কঠিন ছিল।

সাদামাটা জীবনযাপনই কি রাজনীতিতে বাধা হয়েছিল?
শাহনূর চৌধুরীর বর্ণনায় জেনারেল ওসমানীর একটি প্রচলিত গল্প উঠে আসে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঢাকা থেকে সিলেটে সাধারণ বাসে যাতায়াত করতেন। একবার বাসের অপেক্ষমাণ যাত্রীদের একজন তাঁকে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁকে দেখতে জেনারেল ওসমানীর মতোই লাগছে কিনা—আর ওসমানী শুধু মাথা নেড়ে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
এই সাদামাটা জীবনযাত্রা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় পরিচয়, কিন্তু সেই যুগের নির্বাচনী রাজনীতিতে যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ও সাংগঠনিক শক্তি নির্ণায়ক ভূমিকা রাখত, সেখানে এই ধরনের সাদামাটা উপস্থিতি প্রচারণার দিক থেকে তাঁকে পিছিয়ে রেখেছিল বলেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।
উত্তরাধিকার: হেরেও যিনি ইতিহাসে থেকে গেছেন
জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি এর কারন বহুবিধ। তবে শাহনুর চৌধুরী মনে করেন নির্বাচনে হারলেও জেনারেল ওসমানীর ঐতিহাসিক অবস্থান এতে ক্ষুণ্ণ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর নামে বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম ও জাদুঘর থাকলেও, শাহনূর চৌধুরীর মতে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর স্মৃতি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
(জেনারেল ওসমানীর ব্যক্তিজীবন, বাকশাল-বিরোধী পদত্যাগ এবং তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের সিরিজের অন্যান্য লেখাগুলো পড়ুন।)
ভিডিওতে দেখুন: জেনারেল ওসমানী কেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি এই বিষয়ে শাহনূর চৌধুরীর সম্পূর্ণ বক্তব্য শুনুন নিচের ভিডিওতে।