অভিনেত্রী আজমেরী জামান রেশমা ‘মেঘের পর মেঘ’এর আড়ালে


রেশমা ছিলেন ১৯৬০ এর দশকের রোমান্টিক নায়িকা। ঢাকার ছবি ছাড়াও লাহোর ও করাচীর ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন।

রেশমা’র আসল নাম – ‘আজমেরি জামান’। লিখেছেন চলচ্চিত্র ও ভ্রমণ লেখক লিয়াকত হোসেন খোকন।

Table of Contents

 

 
তাঁর জন্ম ১৯৩৮ সালের ৩১ মার্চ মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ির ধামারন গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কাজী আমির হোসেন, তিনি ছিলেন কলেজের অধ্যাপক। তাঁর মাতার নাম বেগম শফিকুননেছা বাহারমান্দ বানু।
 
 
রেশমারা ছিলেন চার বোন। তাঁর ছোট বোন নাজমা আনোয়ার নামকরা অভিনেত্রী ছিলেন বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। অভিনেত্রী দিলারা জামান তাঁর খালাতো বোন।
রেশমা মারা যান ২০২০ সালের ২০ মে ঢাকায়। তাঁকে সমাহিত করা হয় মানিকগঞ্জের সিংগাইরে।
 
 
১৯৯০ সালের কথা।
রেশমার সঙ্গে ওই বছর শেষ বারের মতো দেখা হয়েছিল।
তিনি কথায় কথায় আমাকে জানিয়েছিলেন –
‘সম্ভবত ১৯৫৯ সালে কলকাতায় বেড়াতে গেলাম। ক্যাপ্টেন মুরাদ ও নূরজাহানের বাসাতে
এক ফাংশনে স্বামী – স্ত্রী উভয়ে উপস্থিত হলাম।
 
 
সেখানে অশোক কুমার এবং আরও অনেক বড় বড় চিত্র তারকাকে দেখলাম।
কলকাতায় সে সময় অশোক কুমার
এসেছিলেন ‘হসপিটাল’ ছবির স্যুটিং করতে। নূরজাহান কিন্তু এক সময় কাজী নজরুল ইসলামের চোখে প্রেমিকা ছিলেন। নূরজাহানের বয়স অনেক তবুও দেখতে তখনও  সুন্দরী।
নূরজাহান ও মুরাদের ছোট্ট ফুটফুটে একটি
মেয়ে – ওর নাম ‘রেশমা’।
 
 
ওকে দেখে এতই অভিভূত হলাম যে অবশেষে এই নামটির প্রতি আমার ভীষণ দুর্বলতা জন্মালো মনের গহীনে। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে যোগ দিয়ে আমি আজমেরি নাম পাল্টিয়ে ” রেশমা ” নামে আত্মপ্রকাশ করলাম।’
 
রেশমার বাবা ছিলেন মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ – সেই জন্য বেশ কয়েক বছর তাঁকে মুন্সিগঞ্জ থাকতে হয়েছিল।
সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন মুন্সিগঞ্জের এ, বি,  জি এম স্কুলে। পরে ঢাকায় চলে আসেন।
ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন মতিঝিল সেন্ট্রাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে।
 
 
ঢাকার হলিক্রস কলেজে পড়াকালীন সময়ে রেশমা বেতারে ঘোষিকা হিসেবে যোগ দেন।
রেডিওতে তিনি যখন ঘোষিকা ছিলেন তখন রেডিওর উর্দ্ধতন কর্মকর্তা জামান আলীর সঙ্গে তাঁর
বিয়ে হয়। সেটা ছিল ১৯৬১ সালের কথা।
 
 
রেশমার অভিনীত প্রথম ছবির  – ‘জিনা ভি মুশকিল’। এ ছবির পরিচালক ছিলেন – তাহের চৌধুরী।
ছবিটির কাজ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল।
ওই ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হাসান ইমাম। ১৯৬৭ সালে  কাজী জহির পরিচালিত
‘নয়ন তারা’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।
 
 
রেশমা অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হলো –
ইন্ধন। নায়ক রহমান পরিচালিত এ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল – ১৯৬৬ সালের ১৫ জুলাই।
মিলন ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন – রহমান , রেশমা , গোলাম মুস্তাফা , ইনাম আহমেদ , ফ্যাটি মোহসীন , ফনী , রুবিনা।
 
 
চকোরী। এ ছবির পরিচালক ছিলেন – এহতেশাম।
ছবিতে অভিনয় করেছিলেন – নাদিম ( নাজির বেগ)  , শাবানা ( রত্না) , রেশমা, ইরফান, গোলাম মুস্তফা, জলিল আফগানী, ডিয়ার আসগর এবং আরও অনেকে।
রেশমা এ ছবিতে ছিলেন শহরের মেয়ে। আর শাবানা ছিলেন গাঁয়ের মেয়ে।
চকোরী ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২২ শে মার্চ।
 
 
ভাওয়াল সন্ন্যাসী। রওনক চৌধুরী পরিচালিত
ভাওয়াল সন্ন্যাসী ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন- রেশমা , শওকত আকবর , খলিল , কাজী খালেক , রানী সরকার , আশিষ কুমার লোহ , আনোয়ারা জামাল , ইনাম আহমেদ এবং আরও অনেকে।
এই ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছিল ভাওয়াল রাজবাড়ির সেই রাজবধূর পরকীয়া প্রেমের কাহিনী নিয়ে।
 
 
রাজবধূ পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হয়ে স্বামীকে এবং সঙ্গে তাঁর ভাই , পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাস গুপ্ত ( তাঁর সঙ্গে রাজবধূর পরকীয়া প্রেম ছিল ) , বাবুর্চি , কেরানি , চাকর সহ ২৫ জনের একটি দল নিয়ে দার্জিলিংয়ে যান । তখনই রাজবধূ তাঁর স্বামীকে মেরে ফেলার জন্য খেতে দিয়েছিলেন বিষ ।
 
 
অজ্ঞান হয়ে গেলেন রাজা। সবাই ভাবলো কুমার  আর নেই। দাহ করার জন্য কুমারকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো। তারপরে নামলো মুষলধারে বৃষ্টি …দাহ না করে সবাই ফিরে এলেন । তারপর যা যা ঘটেছিল তা পরিচালক রওনক চৌধুরী তাঁর ভাওয়াল সন্ন্যাসী ছবিতে তুলে ধরে ছিলেন। ছবিতে রাজ বধূর  চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রেশমা।
শওকত আকবর সেজেছিলেন – কুমার।
খলিল অভিনয় করেছিলেন চিকিৎসক আশুতোষ দাস গুপ্তের চরিত্রে।
 
 
দরশন। এ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৭ সালের  ৮ সেপ্টেম্বর। এটি ছিল ঢাকার উর্দূ ছবি।
ছবিতে অভিনয় করেছিলেন – রহমান, শবনম,ফতেহ লোহানী, গরজ বাবু, মেহফুজ, ইকরামউল্লাহ, আফজাল, কুতুবুল আলম, রুমানা।
অতিথি শিল্পী ছিলেন – রেশমা।
 
 
জিনা ভি মুশকিল। এ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল – ১৯৬৭ সালের ৭ ই জুলাই।
 
 
চাঁদ আওর চাঁদনী। এহতেশাম পরিচালিত
চাঁদ আওর চাঁদনী  ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল
১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল। এটি ছিল ঢাকার উর্দূ ছবি। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন –
শাবানা, নাদিম, পাপিয়া, রেশমা, সুলতানা, ডিয়ার আসগর এবং ফবিদ আলী।
 
 
দিল এক শীশা। মুক্তির তারিখ ৮ ডিসেম্বর ১৯৭২। আলাউদ্দিন পরিচালিত দিল এক শীশা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন -শওকত আকবর, রেশমা, শর্বরী, ইরফান। এটি ছিল উর্দু ছবি।
 
 
সূর্য উঠার আগে। নজমুল হুদা মিন্টু পরিচালিত সূর্য উঠার আগে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭০ সালের ৯ জানুয়ারি। সুজাতা প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন – সুজাতা , আজিম , রেশমা , আহসান এবং আরও অনেকে।
 
 
মনজিল হ্যায় জাঁহা দিল। মুক্তির বছর – ১৯৭৩ সাল। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – মোঃ আলী। এটি লাহোরের ছবি।
 
শাহনাই। মুক্তির বছর – ১৯৭৩ সাল। এ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – কামাল। এটি লাহোরের ছবি।
 
আনোখি আদা। মুক্তির বছর – ১৯৭৪ সাল। তাঁর নায়ক ছিলেন – আদিল। এটি লাহোরের ছবি।
 
 
১৯৭৬ সালের দিকে রেশমা লাহোর
ছেড়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।
 
 

১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আলাদিন আলিবাবা সিন্দাবাদ’ ছবিতে রেশমা অবিস্মরণীয় অভিনয় দেখিয়েছিলেন। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – ইলিয়াস জাভেদ।

 
 
সোনার হরিণ। সিরাজুল ইসলাম সিরাজ পরিচালিত
সোনার হরিণ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর। এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন –
কবরী, ববিতা, শাবানা, সুচরিতা, রেশমা, বুলবুল আহমেদ, রাজ্জাক, আনোয়ারা জামাল, গোলাম মুস্তফা, সুমিতা দেবী, মিনু রহমান, টেলি সামাদ, আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল, ব্ল্যাক আনোয়ার, নারায়ণ চক্রবর্তী।
 
 
এছাড়া রেশমা অভিনীত আরও উল্লেখযোগ্য ছবি হলো –
শেষ উত্তর , সোনার তরী , কুদরত , মেঘের পরে মেঘ , সোনার তরী , সুখ দুঃখের সাথী।
 
 
 
 
রেশমা স্মৃতি –
সম্ভবত ১৯৮৮ সালের কথা।
তিনি আমাকে পিছু টানেন আজও
চোখে ভাসে – সেই দিনের কথা
উনি এলেন – কবিতা নিয়ে ,
আমার হাতে দিয়ে বললেন , সুজাতা ভক্ত –
দেখোতো আমার কবিতাটা কেমন হয়েছে ?
পড়া শেষ হতেই বললেন ,  চলো যাই সম্পাদকের কাছে ….
তখন  সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে।
 
 
সম্পাদক হাসলেন – ‘কত সুন্দরী রমণী’। রেশমার মুখে ততক্ষণে হাসি ফুটে উঠলো।
 
 
বৈচিত্র্যময় কেরিয়ারের অধিকারিণী রেশমা ১৯৬০ এর দশকে এবং ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশনের অভিনেত্রী হিসেবে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। ‘মুখরা রমনী বশীকরণ’ নাটকে তাঁর অভিনয় আজও হয়তো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন।
 
 
১৯৬০ সালে রেশমা রেডিওতে ভয়েস আর্টিস্ট, উপস্থাপক ও সংবাদ পাঠিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।
রেশমার দুই সন্তান, তাঁদের নাম রাহবার খান ও জয়া খান।