ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাস থেকে শুরু করে গ্যালারির উত্তেজিত কণ্ঠস্বর সবখানেই আজ একটাই উচ্চারণ: GOAT। কিন্তু লিওনেল মেসিকে ‘GOAT’ বলা হয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর অসাধারণ কেরিয়ারের প্রতিটি মূহুর্তে। ‘GOAT’ আসলে ইংরেজি ‘Greatest Of All Time’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ, যার অর্থ ‘সর্বকালের সেরা‘। ফুটবলের ইতিহাসে এমন নাম খুব কমই আছে যাকে এই একটি শব্দ দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো যায়। মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি এক অনুভূতি, এক আশ্চর্য জাদু, যা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা খুঁজে বের করব কেন পুরো বিশ্ব তাকে একবাক্যে মেনে নিয়েছে সর্বকালের সেরা হিসেবে।
মেসিকে goat বলা হয় কেন?
যখন কেউ মেসির নাম নেয়, প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো তাঁর সাফল্যের বিশাল তালিকা। ৮টি ব্যালন ডি’অর—শুধু এই একটা রেকর্ডই বলে দেয় তিনি অন্য কারও থেকে কত এগিয়ে। এই পুরস্কারটি কোনো সাধারণ সম্মান নয়; এটি বিশ্বের সেরা ফুটবলারকে দেওয়া হয়। মেসি এই পুরস্কার জিতেছেন ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৩ সালে। কোনো খেলোয়াড় এখন পর্যন্ত এই রেকর্ড ছুঁতে পারেননি। এছাড়াও, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, ১০টি লা লিগা শিরোপা, ৭টি কোপা দেল রে এবং অসংখ্য ক্লাব বিশ্বকাপ ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতেছেন তিনি।
কিন্তু এসব রেকর্ডের ভিড়ে সবচেয়ে বড় অর্জনটি ছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা শুধু একটি শিরোপা জয় ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনা প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল, আর সেই নায়ক ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। অনেকেই বলতেন মেসি বিশ্বকাপ না জিতলে তাকে পেলে বা ম্যারাডোনার সমকক্ষ করা যাবে না। কিন্তু মেসি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এক অবিস্মরণীয় ফাইনাল খেলে।
| অর্জন | সংখ্যা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ব্যালন ডি’অর | ৮ | সর্বোচ্চ রেকর্ড |
| বিশ্বকাপ শিরোপা | ১ (২০২২) | ফাইনালে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগ | ৪ | বার্সেলোনার হয়ে |
| লা লিগা শিরোপা | ১০ | বার্সেলোনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ |
| কোপা আমেরিকা | ১ (২০২১) | প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা |
অসাধারণ ড্রিবলিং এবং খেলার শৈলী
মেসির খেলা শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তাকে মাঠে দেখলে বোঝা যায় কেন তাকে ‘ফুটবলের জাদুকর’ বলা হয়। বল নিয়ে তাঁর দৌড়ানোর ভঙ্গি, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতা—এমন কিছু যা সত্যিই অতুলনীয়। ২০১২ সালে তিনি এক বছরেই ৯১টি গোল করে ফিফার বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছিলেন। আগে জার্ড মুলারের ৮৫ গোলের রেকর্ড ছিল, যা ফুটবল বিশেষজ্ঞরা চিরকালের রেকর্ড ভাবতেন। কিন্তু মেসি সেটা সহজেই অতিক্রম করে দেখিয়ে দিয়েছেন তার সামনে কোনো সীমারেখা নেই।
মেসির ড্রিবলিং কেবল বল নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে রয়েছে এক ধরনের শিল্প। একটি সাদামাটা বল নেওয়ার মুহূর্ত, প্রতিপক্ষের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল বের করে দেওয়া, আর গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে জাল কাঁপানো—একটি পুরো সিনেমার মতো মনে হয়। ২০০৭ সালের কোপা দেল রে সেমিফাইনালে গেটাফের বিরুদ্ধে মেসির গোলটি এখনো স্মরণীয়। তিনি ম্যারাডোনার বিখ্যাত গোলের স্টাইলে বল নিয়ে প্রায় ৬০ মিটার দৌড়ে গিয়ে গোল করেছিলেন। সেটা ছিল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
গোল ও অ্যাসিস্টের অমোঘ রেকর্ড
মেসির গোল করার ক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এখন পর্যন্ত তিনি ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৮০০-এর বেশি গোল করেছেন। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় তার অ্যাসিস্টের রেকর্ডটিও। ফিফা ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ডটি মেসির দখলে। তিনি শুধু গোলদাতা নন; তিনি গোল করানোর ক্ষেত্রেও সেরা। বার্সেলোনায় থাকাকালীন সময়ে, লুইস সুয়ারেস এবং নেইমারের সঙ্গে মেসির ট্রিও গড়ে তুলেছিল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ।
- মেসি ফুটবলের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি এক ক্লাবে ৬০০-এর বেশি গোল করেছেন (বার্সেলোনায় ৬৭২ গোল)।
- তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা (ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পর)
- লা লিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা (৪৭৪ গোল)
- এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড (লা লিগায় ৫০ গোল, ২০১১-১২ মৌসুমে)
- বিশ্বকাপে ১৩ গোল, যা আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ
অনন্য মানসিকতা এবং দলের প্রতি নিষ্ঠা
ফুটবল মাঠে মেসিকে দেখা যায় অত্যন্ত বিনয়ী একজন মানুষ হিসেবে। তাঁর কোনো অহংকার নেই, উদ্ধত আচরণ নেই। অথচ তার পায়ের নিচে রয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় রেকর্ডগুলো। যখন ফ্রান্সের সঙ্গে ২০২২ সালের ফাইনালের শেষ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে গোল করে ম্যাচ ২-২ করে দেয়, কারও চোখে আতঙ্কের ছায়া পড়েছিল। কিন্তু মেসি তখনও দলকে শান্ত রাখেন। তিনি জানেন ফুটবল কখনো শেষ হয় না, যতক্ষণ শেষ হুইসল না বাজে। সেই ম্যাচ তিনি নিজের হাতে গড়ে দেন এবং পেনাল্টি শুটআউটে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছিলেন।
এই যে মানসিক শক্তি এবং দলের প্রতি দায়িত্ববোধ, এটাই মেসিকে অন্যদের থেকে সবার ওপরে রাখে। ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে তুলনা সর্বদা চলেছে, কিন্তু মেসির পক্ষে বলা হয়েছে যে টিম গেম তাকে বেশি সমৃদ্ধ করেছে। রোনাল্ডো ছিলেন বিশাল এক যোদ্ধা, কিন্তু মেসি ছিলেন সেই সেনাপতি যিনি পেছন থেকে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলেন।
কেন তাকে উৎসর্গ করা হয় ‘GOAT’ উপাধি?
গত দেড় দশকে ফুটবল বিশ্বে কয়েকজন মহান খেলোয়াড় এসেছেন এবং গেছেন। পেলে, ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরাও নিজেদের সময়ে অমর হয়ে আছেন। কিন্তু মেসির মাঝে আমরা একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ পাই। তিনি উচ্চতা নিয়ে কোনো সমস্যা না করে মাঠে মধ্যকার প্রতিটি প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন খুব সাধারণ, মিডিয়ার সামনে আসেন কম, কিন্তু মাঠে তাঁর কর্মকাণ্ডই একমাত্র বক্তব্য।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরাও মেসির মাঠের ম্যাজিক দেখে অবাক হয়ে গেছে। ২০১১ সালে ঢাকায় বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচে মেসি না খেললেও, তাঁর খেলা নিয়ে এখনো কথোপকথন চলছে এদেশের অলিগলিতে। ২০২৬ সাল এখন মেসির কাছে আরও একটি চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপ জিতেছেন, ক্লাব ক্যারিয়ার শেষের দিকে—কিন্তু তাঁর শৈলী কখনো শেষ হয় না। মেসিকে GOAT বলার কারণ শুধু তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেট নয়; বরং তিনি ফুটবলকে একটি শিল্পের মঞ্চে পরিণত করেছেন, যেখানে গোল একটি সাধারণ উপায়, আর ক্যানভাসে রঙ ছড়ানো নয় বরং প্রেম ছড়ানো।
যদি শুধু সংখ্যার দিকে তাকাই, মেসির প্রতিটি রেকর্ড নতুন করে লেখা হয়েছে ফুটবলের নিয়ম বইতে। যদি শুধু অনুভূতির দিকে তাকাই, তবে তাঁর প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি পাস, প্রতিটি গোল একটি স্মৃতি তৈরি করেছে, যা কখনো ম্লান হবে না। তাই, যখন কেউ বলে “মেসি হলেন ফুটবলের ঈশ্বর,” তখন সেটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি অনুভব, একটি বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসেই মেসিকে ‘GOAT’ বলার শিকড় লুকিয়ে আছে—আগামী প্রজন্মও তাঁকে এভাবেই মনে রাখবে।