হৃদয়ের পৌষ – আহা ডানায় কী অফুরান প্রাণ


কথায় বলে, ‘পৌষমাস লক্ষ্মীমাস’। অর্থাৎ পৌষমাসে সর্বসাধারণের বিশেষকরে চাষিদের ভান্ডার থাকে পরিপূর্ণ। নতুন সবজিপাতি ওলকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, পালংশাক, সরিষার শাক, লাল শাক, মূলার শাকে বাজার মো মো করে। চাষিদের ঘরে ওঠে নতুন গুড়। নতুন গুড়, নতুন চাল দিয়ে নবান্ন হয় ঘরে ঘরে।

পৌষমাসের সংক্রান্তিতে তাই সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে উদযাপিত হয় পৌষপার্বণ বা পিঠেপুলি। সারা মাস ধরে তার প্রস্তুতি চলে। এখন তো ঢেঁকির আওয়াজ শোনাই যায় না।

এককালে পৌষমাস জুড়ে চালের গুঁড়ি প্রস্তুত করার জন্য গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ঢেঁকির শব্দ শোনা যেত। আমাদের বাংলাদেশের বৃহত্তর বরিশাল সুদূর অতীত থেকে নদী -নালা -খাল -বিলের অঞ্চল বলে পরিচিত। কারণ, বরিশালে উৎপন্ন হয় প্রচুর ধান -কলা -পেয়ারা – গো মহিষের দুধ এবং শাকসবজি। একদা, এসব দেবতার ভোগের উপকরণ নৈবেদ্য প্রস্তুত করতে এই উপাদানগুলির বিশেষ প্রয়োজন হতো। দুর্ভাগ্য ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে সবকিছু উল্টেপাল্টে যায়। এখন যারা বরিশাল অঞ্চলে বসবাস করেন তারা দেবতা কি (?) তা জানতে চায় না, বুঝতে চায় না। জানে শুধু আখের গুটিয়ে নিতে। সবকিছু চায় নিজে, কাউকে কিছু দিতে চায় না। পরেরটা দখলে নিতে চায় এবং করেও তা-ই। 

যে জন্য আজ যা কিছু উৎপন্ন হচ্ছে, তা চাহিদা মিটাতে পারছে না। সবাই যেন কেমন যেন একটা অভাব ও অতৃপ্তিতে ভুগে ভুগে হাহুতাশ করছে।

এই পৌষ মাসে বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় একসময় বিশেষ ধরনের বেগুন উৎপন্ন হতো। যা কি-না দেখতে অবিকল বেগুনি রঙের মতো। সেই বেগুন এখন আর দেখা যায় না। মনে পড়ে, সেই বেগুন স্বাদে গন্ধে ছিল কি অপূর্ব। ঘরে ঘরে সেই বেগুন ষাট বছর আগেও দেখা যেত। কোথায় হারিয়ে গেল সেই বেগুনি রঙের বেগুন। ধানাকাটা মাঠে প্রচুর ন্যাড়া খেয়ে দুগ্ধবতী গাভীগুলি প্রচুর দুধ দিত।

এখন আর সহসা চোখে পড়ে না দুগ্ধবতী গাভী। সবাই যেন দোকানের গুড়ো দুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

একদা শুধু বরিশাল অঞ্চলই নয়, সমগ্র বাংলাদেশেই পৌষমাস লক্ষ্মীমাস বলে আদৃত হতো। যে জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা একসময় পৌষমাস জুড়ে প্রস্তুতি নিয়ে পৌষসংক্রান্তিতে ধূমধাম সহকারে পালন করতেন ভোগালি বিহু উৎসব সহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান।

এখন তো এই পৌষমাসে বাংলাদেশের কোথাও পৌষ পার্বনের আয়োজন আর হয় না। সবাই যেন দুয়ার দিয়ে নিজেকে নিয়ে নিজে ব্যস্ত হয়ে আছে। কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষরা যে একদিন জাতিধর্ম নির্বিশেষে পিঠেপুলির উৎসব ও প্রতিযোগিতায় মেতে থাকত। সে কথা আজ কেউ মনেও করে না।

পৌষমাসের সেই ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলি যেন হারিয়ে গেছে বাঙালির ঘর থেকে। তবুও আমাদের প্রত্যাশা, পৌষমাস নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনসাধারণ সহ সর্বসাধারণের ঘরে কিছুটা হলেও আবার আনন্দের ছোঁয়া এনে দিক। আবার গ্রামীণ মহিলারা গান বাঁধুক, ‘পৌষমাস -লক্ষ্মীমাস, এসো পৌষ, থাকো পৌষ – যেয়ো না ওগো পৌষ’।

আহা ডানায় কী অফুরান প্রাণ –

বৃহদাকার শামুকখোল বা ওপেন বিল ষ্টর্ক বা এশিয়ান ওপেন বিল পাখির আনাগোনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এটা আশার কথা। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, কেউ কেউ এদের মাংস খায় বলে শোনা যায়। এটা কি ঠিক? ওরা অতিথি পাখি – ওদেরকে ধরে ধরে যারা খায়, তাদের মধ্যে আতিথেয়তা জ্ঞানবোধ কবে যে জাগ্রত হবে তা বলা মুশকিল। যারা পাখি ধরে খায় – তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে বলে মনে হয় না।

এই শীতে পাখিপ্রেমীরা যায় বিল -ঝিলের কাছে কিম্বা নদীর চরাঞ্চলে পাখি দেখার জন্য। কোথাও কোথাও ঝিলে প্রচুর কচুরিপানা থাকায় পাখিরা নিজেদের মতো বসবাস করতে পারছে। কচুরিপানার মধ্যে এরা লুকিয়ে থাকতে পারছে। আবার অনেক পাখি তা পারছে না শিকারীদের উৎপাতে। শিকারীদের কথা, ‘ধর পাখি কর জবাই, খাই পাখির মাংস’। বাংলাদেশের একশ্রেণির মানুষের মন মানসিকতা যদি এ রকম হয় – তাহলে অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা কোথায়? কবেই বা তাদের প্রতি জনসাধারণ আতিথেয়তা দেখাতে শিখবে।

আমরা চাই, পাখিরা কচুরিপানার মধ্যে বা গাছগাছালির ডালপালায় লুকিয়ে থাকুক। বংশবৃদ্ধির পক্ষে এটি সহায়ক হবে। পাখিরা যেখানে যেখানে এসেছে পাখি দেখতে ভিড় জমছে সেখানেই।  পক্ষিপ্রেমীরা সরাসরি দেখছেন। কেউ বাইনোকুলারে দেখছেন, কেউ লেন্সবন্দি করছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিযায়ী পাখিদের ছড়াছড়ি এ সময়ে। আমাদের সকলের দায়িত্ব, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে পাখিদের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা। স্থানীয় প্রশাসনেরও নজর থাকুক সারা বছর।

ধৈর্য, সময় আর ভালবাসা থাকলে এই পাখি দেখা যায় সঙ্গে যদি থাকে বাইনোকুলার ও ক্যামেরা, তবে তো কথাই নেই। বৃহত্তর সিলেট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা সহ বিভিন্ন স্থানে পরিযায়ী নানারকম পাখি দেখা যায়। সিলেটের সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলগুলির স্বচ্ছ ফটিক জল পাখিপ্রেমীদের চোখকে আরাম দেয়। প্রতি বছর শীত পড়তেই ঝাঁকে ঝাঁকে নানা পরিযায়ী পাখি আসতে থাকে। বেশির ভাগই হাঁস জাতীয়। স্থানীয়রা বলে হাঁস বিগড়ি বা হাঁস খড়। দেখা যায় কালো হালকা লাল -সাদায়, মাথায় ময়ূরের মতো ছোট পেখম দেওয়া এক পাখি। স্থানীয়রা বলে পান পায়রা। এছাড়া সারা বছরই দেখা যায় পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বেনেবউ, বাবুই ইত্যাদি।

আরও পড়ুন: ম’ -এর মর্যাদা দিতে হবে যেসব কারনে

পাখির পরিযানের অন্যতম দুটি কারণ হচ্ছে খাদ্যের সহজলভ্যতা আর বংশবৃদ্ধি। উত্তর গোলার্ধের অধিকাংশ পরিযায়ী পাখি বসন্তকালে উত্তরে আসে অত্যধিক পোকামাকড় আর নতুন জন্ম নেওয়া উদ্ভিদ ও উদ্ভিদাংশ খাওয়ার লোভে। শীতকালে বা অন্য সময়ে খাবারের অভাব দেখা দিলেও এরা আবার দক্ষিণে ফিরে যায়। আবহাওয়াকে পাখি পরিযানের অন্য আরেকটি কারণ হিসেবে ধরা হয়। শীতের প্রকোপে অনেক পাখিই পরিযায়ী হয়। তবে খাবারের প্রাচুর্য থাকলে প্রচণ্ড শীতেও এরা বাসস্থান ছেড়ে নড়ে না। আলোর তীব্রতাও এদের পরিযানের আরেক কারণ।

দীর্ঘদৈর্ঘ্যের পরিযায়ী পাখিরা উত্তর গোলার্ধে শীত শুরুর আগেই বিষুবরেখার দিকে অর্থাৎ কম শীতের জায়গা লক্ষ করে যাত্রা শুরু করে। আবার শীতের প্রকোপ কমে এলে অর্থাৎ বসন্ত শুরুর আগ মুহূর্তে নিজ দেশে ফিরে যায়। তবে শীতের প্রকোপেই এরা গ্রীষ্মাঞ্চলের দিকে যায়, এই ধারণাটিও পুরো ঠিক নয়। পাখিদের শরীরে উষ্ণরক্ত, গায়ের রেশমি পালক অনেকটাই শীত ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম। স্থান বদলের মূল কারণটা খাদ্যসঙ্কট।

বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে গাছে শত শত কাক, পেঁচা, চড়াই, শালিক ইত্যাদি দেখা যায়। সেখানকার পরম নানা প্রজাতির কবুতর। সারা বছর ধরেই এই কবুতর দেখা যায় বিশেষ করে সিলেটের কীন বা সুরমা ব্রিজের উপরে। প্রতিদিন সকাল ও দুপুরে সিলেট এলাকার লোকজন কবুতরদের খাবার দেয়। তখন দেখতে খুব সুন্দর লাগে। পৌষ -মাঘমাসে সেখানে মেলাও বসে। তবে একসময় বাংলাদেশের কোথাও কোথাও মাটির পাখি বানিয়ে মেলা করতো। যা কিনা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পৌষের শীত পড়েছে। এই তো সময় দূরদূরান্ত থেকে আরও পাখিদের আসার সময়। আহা ডানায় কী অফুরান প্রাণ। সুতরাং পাখিদের দু’নয়ন ভরে দেখি। ওদেরকে আতিথেয়তা দেখাই। পাখিদের প্রতি সবার মধ্যে মমত্ববোধ জাগুক – এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।