যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ বর্তমান সময়ে দেশের বেকার যুবক ও যুবনারীদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এই যুগে প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সারা দেশে শিক্ষিত বেকারদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জন্য নতুন একটি বিশাল প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তরুণরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিক ফ্রিল্যান্সিং শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?
আমাদের দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী স্নাতক বা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই দীর্ঘ সময় বেকার বসে থাকেন। এই বেকারত্ব দূর করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন। আপনি যদি এক বছরের জন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইটি কোর্স করতে যান, তবে সেখানে আপনার কয়েক হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু সরকারি এই প্রকল্পে আপনি কোনো টাকা ছাড়াই উন্নত মানের প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন।
এই প্রশিক্ষণের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এর বিশ্বাসযোগ্যতা। সরকারি সনদপত্রের মাধ্যমে আপনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবেন। এছাড়া প্রশিক্ষণের মান বজায় রাখতে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা হাতে-কলমে প্রতিটি বিষয় বুঝিয়ে দেন। আপনি যদি প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে এই প্রশিক্ষণ আপনার জন্য প্রথম ধাপ হতে পারে।.
প্রশিক্ষণ প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য ও লক্ষ্য
“দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি সাধারণ কোর্স নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রতিটি জেলা থেকে একদল দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা যারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। ই-লার্নিং এন্ড আর্নিং লিমিটেড নামক একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার এই পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
২০২৬ সালের এই বিশেষ প্রশিক্ষণ বিজ্ঞপ্তিতে ৩ মাস মেয়াদী একটি কোর্সের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ৩ মাসে আপনাকে বেসিক কম্পিউটার থেকে শুরু করে মার্কেটপ্লেসে কীভাবে কাজ করতে হয়, তার আদ্যোপান্ত শেখানো হবে। এর ফলে কোর্স শেষে আপনি নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন। আপনি যদি সঠিক গাইডলাইনের অভাবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে না পারেন, তবে এই সুযোগটি আপনার হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
আবেদনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্তসমূহ
সরকারি কোনো প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। নিচের তালিকায় যোগ্যতাগুলো দেখে নিন:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: আবেদনকারীকে অবশ্যই ন্যূনতম উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি (HSC) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাও আবেদন করতে পারবেন।
- বয়সসীমা: প্রার্থীর বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী এই বয়স গণনা করা হবে।
- প্রাথমিক জ্ঞান: কম্পিউটার চালানো বা আইসিটি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যাবে।
- ভাষাগত দক্ষতা: যেহেতু ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলতে হয়, তাই ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগ করার ক্ষমতা থাকা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এর বিশেষ সুবিধাসমূহ
এই কোর্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সুযোগ-সুবিধা। সাধারণ অন্য যেকোনো প্রশিক্ষণে আপনাকে যাতায়াত ও খাবারের খরচ নিজেকে বহন করতে হয়, কিন্তু এখানে সরকার আপনাকে উল্টো আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। এটি করা হয়েছে যাতে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থের অভাবে প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত না হয়।
ভাতা ও খাবার সুবিধা
প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হবে। মাসের শেষে উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই টাকা সরাসরি প্রশিক্ষণার্থীর হাতে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়া প্রশিক্ষণের সময় যাতে ক্লান্তি না আসে, সেজন্য প্রতিদিন তিন বেলা উন্নত মানের খাবার ও নাস্তা দেওয়া হবে। এই সুবিধাগুলো দেশের অন্য কোনো ফ্রিল্যান্সিং কোর্সে সচরাচর দেখা যায় না।
সরকারি সনদপত্র ও কর্মসংস্থান সহায়তা
৩ মাসের সফল প্রশিক্ষণ শেষে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে একটি মূল্যবান সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে। এই সার্টিফিকেট ব্যবহার করে আপনি বিভিন্ন বেসরকারি আইটি ফার্মে চাকরির আবেদন করতে পারবেন। এছাড়া যারা ভালো ফলাফল করবেন, তাদের জন্য মার্কেটপ্লেসে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ মেন্টরশিপের ব্যবস্থা থাকবে।
| বিবরণ | তারিখ ও সময় |
|---|---|
| অনলাইনে আবেদনের শেষ সময় | ০৩ মার্চ ২০২৬ খ্রি. |
| লিখিত পরীক্ষার তারিখ | ০৬ মার্চ ২০২৬ খ্রি. |
| মৌখিক পরীক্ষার তারিখ | ০৭ মার্চ ২০২৬ খ্রি. |
| চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ | ১০ মার্চ ২০২৬ খ্রি. |
| প্রশিক্ষণের মেয়াদ | ০১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন ২০২৬ |
অনলাইনে আবেদনের সঠিক নিয়ম ও ধাপসমূহ
অনেকেই ইন্টারনেটে ভুল লিংকে প্রবেশ করে প্রতারিত হন। তাই সঠিক নিয়মে আবেদন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এর জন্য আবেদন করতে হলে আপনাকে নির্ধারিত পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে। নিচে ধাপগুলো বর্ণনা করা হলো:
১. প্রথমে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নির্ধারিত ওয়েবসাইট বা প্রকল্প বাস্তবায়ণকারী প্রতিষ্ঠানের লিংকে প্রবেশ করুন। আবেদন করার লিংকটি হলো: https://e-laeltd.com/48-student-reg-jubo।
২. সাইটে প্রবেশের পর আপনার নাম, পিতার নাম, মাতার নাম এবং স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিখুন। মনে রাখবেন, আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সাথে যেন এটি মিলে যায়।
৩. আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য যেমন- পাসের সন, রেজাল্ট এবং বোর্ডের নাম ইনপুট দিন।
৪. বর্তমান সচল একটি মোবাইল নম্বর দিন। কারণ আপনার পরীক্ষার তারিখ ও ফলাফল এই নম্বরেই ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে জানানো হবে।
৫. সব তথ্য পুনরায় যাচাই করে ফর্মটি জমা দিন এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কপি প্রিন্ট বা ডাউনলোড করে রাখুন।
নির্বাচন পদ্ধতি: লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি
যেহেতু আসন সংখ্যা সীমিত এবং প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি থাকে, তাই একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যদের বাছাই করা হয়। আপনি যদি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ এ টিকতে চান, তবে আপনাকে সামান্য কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে।
লিখিত পরীক্ষায় সাধারণত সাধারণ জ্ঞান, ইংরেজি এবং আইসিটি বিষয়ক প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশ, ইন্টারনেটের প্রাথমিক ধারণা এবং মাইক্রোসফট অফিস প্রোগ্রাম সম্পর্কে প্রশ্ন বেশি আসে। আর মৌখিক পরীক্ষায় আপনার আগ্রহ ও ধৈর্য যাচাই করা হয়। পরীক্ষকদের সামনে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলুন এবং ফ্রিল্যান্সিং করার প্রতি আপনার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তা প্রকাশ করুন। সফল হতে নিয়মিত আপডেট পেতে আপনি সাগরপার ডট কম সাইটটি অনুসরণ করতে পারেন যেখানে ক্যারিয়ার বিষয়ক নানা পরামর্শ দেওয়া হয়।
| সুবিধার নাম | পরিমাণ/বিবরণ |
|---|---|
| কোর্স ফি | সম্পূর্ণ ফ্রি (৳০) |
| দৈনিক যাতায়াত ভাতা | ২০০ টাকা |
| দৈনিক খাবার | ৩ বেলা (সকাল, দুপুর ও বিকাল) |
| মোট প্রশিক্ষণের সময় | ৩০০ ঘণ্টা (প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা) |
| প্রশিক্ষণ উপকরণ | সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত |
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে সাফল্যের জন্য কিছু টিপস
স্রেফ কোর্সে ভর্তি হওয়াই যথেষ্ট নয়। এই প্রশিক্ষণ থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পেতে হলে আপনাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই প্রশিক্ষণ একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে আপনাকে সক্রিয় থাকতে হবে।
- নিয়মিত ক্লাস: প্রতিদিনের ক্লাসে উপস্থিত থাকুন। যেহেতু ভাতা এবং শেখার বিষয়টি উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে, তাই একটি ক্লাসও মিস করবেন না।
- অনুশীলন: ক্লাসে যা শেখানো হবে, বাসায় ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে তা বারবার প্র্যাকটিস করুন। ফ্রিল্যান্সিং হলো প্র্যাকটিক্যাল কাজ।
- নেটওয়ার্কিং: আপনার সহপাঠীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। ভবিষ্যতে গ্রুপ ওয়ার্ক করার ক্ষেত্রে এটি অনেক কাজে আসবে।
- ধৈর্য ধারণ: ফ্রিল্যান্সিং মানেই রাতারাতি বড়লোক হওয়া নয়। দক্ষতা অর্জন করতে সময় লাগে, তাই ধৈর্য হারাবেন না।
কেন এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া জরুরি?
বর্তমানে গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত মজবুত। কিন্তু সঠিক শিক্ষার অভাবে আমাদের তরুণরা ছোট ছোট কাজ করে আটকে থাকছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ আপনাকে এমনভাবে গড়ে তুলবে যাতে আপনি দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্টে কাজ করতে পারেন। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তরের মূল কারিগর হলো প্রযুক্তি দক্ষ যুবসমাজ। আপনি যদি এই স্রোতে নিজেকে শামিল করতে পারেন, তবে আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত।
চাকরির পেছনে না ছুটে নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার যে স্বপ্ন আপনি দেখছেন, তার ভিত্তিপ্রস্তর হতে পারে এই সরকারি কোর্স। এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে আপনি কেবল নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করবেন না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবেন। তাই দেরি না করে দ্রুত অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করুন।
শেষ কথা
বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ আপনার সামনে এক বিশাল দ্বার উন্মোচন করেছে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চমানের শিক্ষা, সাথে যাতায়াত ভাতা ও খাবারের এই অপূর্ব সুযোগ খুব কমই আসে। আপনি যদি ২০২৬ সালের এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেন, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আপনি নিজেকে একজন সফল স্বনির্ভর মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করবেন। মনে রাখবেন, সময় ও সুযোগ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই শেষ সময়ের জন্য বসে না থেকে আজই আপনার আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করুন এবং একটি উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের পথে এগিয়ে যান।