পবিত্র রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের শেষে মুসলিম উম্মাহর জন্য আসে আনন্দের মহিমান্বিত দিন ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দ কেবল বিত্তবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি অন্যতম মাধ্যম হলো সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা। প্রতি বছরের মতো এবারও অনেকের মনে সাধারণ একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতি বছর রমজান মাসে বর্তমান বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফিতরার একটি হার নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৬ সালের জন্য (১৪৪৭ হিজরি) এই হার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। এবারের ফিতরা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি কাজ করেছে। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব ২০২৬ সালের ফিতরার পরিমাণ, এটি আদায়ের নিয়ম এবং কাদের ওপর এটি ওয়াজিব।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা: ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত?
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সভাকক্ষে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি এবং আলেমদের উপস্থিতিতে ২০২৬ সালের ফিতরার হার চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা অনুযায়ী, এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৮০৫ টাকা।
উল্লেখ্য যে, গত বছরও ফিতরার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ হার একই ছিল। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর ফিতরার হারে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে যারা সামর্থ্যবান, তাদের জন্য ইসলামিক বিধান অনুযায়ী উন্নত মানের খাদ্যদ্রব্যের মূল্যে ফিতরা আদায় করা অধিক সওয়াবের কাজ। আপনি যদি জানতে চান ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত, তবে এই দুই সীমার মধ্যে থেকে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনি ফিতরা প্রদান করতে পারবেন।
২০২৬ সালের ফিতরা নির্ধারণের মাপকাঠি
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী মূলত পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের যেকোনো একটি দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। এই পাঁচটি দ্রব্য হলো: আটা (গম), যব, কিসমিস, খেজুর ও পনির। এই পণ্যগুলোর ওজন এবং বর্তমান খুচরা বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করে ফিতরার হার নির্ধারিত হয়েছে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
| খাদ্যদ্রব্যের নাম | নির্ধারিত ওজন | বাজারমূল্য (টাকায়) |
|---|---|---|
| উন্নত মানের আটা বা গম | ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম | ১১০ টাকা (সর্বনিম্ন) |
| যব | ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ৪৪০ টাকা |
| কিসমিস | ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ১,৩২০ টাকা |
| খেজুর | ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ১,৯৮০ টাকা |
| পনির | ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ২,৮০৫ টাকা (সর্বোচ্চ) |
উপরের তালিকা থেকে এটি স্পষ্ট যে, আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো একটি স্তর বেছে নিতে পারেন। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য কেবল সর্বনিম্ন হারের ওপর নির্ভর না করে খেজুর বা পনিরের মূল্যে ফিতরা দেওয়া উত্তম। এই সঠিক তথ্যটি জানলে আপনার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে যে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত টাকা আপনি প্রদান করবেন।
ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর কেন আদায় করতে হয়?
ফিতরা আদায়ের পেছনে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, রমজানের রোজা পালন করতে গিয়ে আমাদের অজান্তে যে সব ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা অনর্থক কথাবার্তা হয়ে যায়, তার কাফফারা হিসেবে ফিতরা কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এটি সমাজের দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষদের ঈদের আনন্দে শামিল করার একটি প্রক্রিয়া। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ফিতরা আদায় করাকে উম্মতের জন্য ওয়াজিব বা আবশ্যক করেছেন।
যাদের কাছে ঈদের দিন সকালে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ) থাকে, তাদের ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। আপনি যদি সাগরপাড় ডট কম-এর নিয়মিত পাঠক হয়ে থাকেন, তবে জানবেন যে ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দান-সাদাকার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা জেনে নিয়ে সঠিক সময়ে এটি আদায় করা প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলিমের দায়িত্ব।
ফিতরা আদায়ের সঠিক সময় ও পদ্ধতি
ফিতরা কখন আদায় করতে হবে তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় থাকে। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী, ফিতরা ওয়াজিব হয় ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময়। তবে ঈদের দুই-একদিন আগে থেকে ফিতরা আদায় করা জায়েজ। সবচাইতে উত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করা। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে আদায় করতে না পারেন, তবে ঈদের দিনের মধ্যে অবশ্যই তা আদায় করে দিতে হবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা জেনে নিয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে ফিতরা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি পরিবারে ৫ জন সদস্য থাকে এবং আপনি যদি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা হিসেবে ফিতরা দিতে চান, তবে মোট ৫৫০ টাকা আদায় করতে হবে। পরিবারের কর্তা ব্যক্তি তার নিজের পাশাপাশি তার স্ত্রী, সন্তান এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবেন।
কাকে ফিতরা দেওয়া যাবে?
জাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিরাই সাধারণত ফিতরা পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ যারা অভাবী, মিসকিন এবং দিনমজুর, তাদের ফিতরা প্রদান করতে হবে। আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যদি কেউ এমন দরিদ্র থাকেন যারা জাকাত গ্রহণের যোগ্য, তবে তাদের ফিতরা দেওয়া সবচাইতে বেশি সওয়াবের কাজ। কারণ এতে দান এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা—উভয় সওয়াব পাওয়া যায়। তবে মসজিদ বা মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে ফিতরার টাকা ব্যবহার করা যাবে না; এটি সরাসরি গরিব মানুষদের মালিকানায় দিতে হবে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত এবং এটি পরিবর্তনের কারণ
অনেকেই জানতে চান কেন প্রতি বছর ফিতরার হার পরিবর্তিত হয় বা কেন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে এত ব্যবধান থাকে। এর মূল কারণ হলো বাজারের নিত্যপণ্যের দাম। আটা বা গমের দাম খেজুর বা পনিরের তুলনায় অনেক কম। ইসলামে যেহেতু পাঁচটি আলাদা পণ্যের সুযোগ রাখা হয়েছে, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিটি পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য যাচাই করে এই হার নির্ধারণ করে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা নির্ধারণের সময় দেখা গেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে গম ও চিনির দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও উন্নত মানের খেজুর ও পনিরের দাম আগের মতোই চড়া রয়েছে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতেই সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। আপনি যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল হন, তবে আপনার উচিত সর্বোচ্চ বা মাঝারি কোনো একটি হার বেছে নেওয়া।
| বিভাগ | ফিতরার ধরন | উপকারিতা |
|---|---|---|
| সাধারণ | আটা/গম (১১০ টাকা) | নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের জন্য সহজসাধ্য |
| উন্নত | খেজুর/কিসমিস (১,৩২০ – ১,৯৮০ টাকা) | গরিবের জন্য বেশি সহায়ক |
| প্রিমিয়াম | পনির (২,৮০৫ টাকা) | অধিক সওয়াব ও সর্বোচ্চ ত্যাগ |
ফিতরা নিয়ে সাধারণ কিছু ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে ফিতরা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন অনেকে মনে করেন ফিতরা কেবল টাকার মাধ্যমেই দিতে হবে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমলে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দেওয়ার প্রচলন ছিল। তবে বর্তমানে আলেমদের মতে, গরিবের উপকারের কথা চিন্তা করে টাকার মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা উত্তম, কারণ টাকা দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করতে পারে।
আবার অনেকে মনে করেন পরিবারের ছোট শিশুদের ফিতরা দিতে হয় না। এটি ভুল ধারণা। পরিবারের নবজাতক শিশুর পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। তাই ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা হিসেব করার সময় পরিবারের প্রতিটি ছোট-বড় সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ফিতরা ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য
জাকাত এবং ফিতরা—উভয়ই আর্থিক ইবাদত হলেও এদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জাকাত বছরে একবার দিতে হয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে, আর ফিতরা দেওয়া হয় রোজার ভুলত্রুটি সংশোধনের জন্য ঈদের খুশির অংশ হিসেবে। জাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পূর্ণ হতে হয়, কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ ঈদের দিন সকালে থাকলেই তা ওয়াজিব হয়ে যায়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা জানার পাশাপাশি এই মৌলিক পার্থক্যগুলো জানাও জরুরি।
শেষ কথা
সারসংক্ষেপে বলা যায়, ২০২৬ সালে (১৪৪৭ হিজরি) বাংলাদেশে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক নির্ধারিত এই হার আমাদের দেশের সব স্তরের মানুষের সামর্থ্য বিবেচনা করে ঠিক করা হয়েছে। ফিতরা কেবল একটি নিয়ম নয়, এটি ইসলামের সাম্য ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মনে রাখবেন, আপনার ছোট একটি দান একজন দরিদ্র মানুষের ঈদের খুশিকে রাঙিয়ে তুলতে পারে। তাই দেরি না করে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরা কত তা মাথায় রেখে সঠিক সময়ে আপনার ও আপনার পরিবারের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করে দিন। মহান আল্লাহ আমাদের সবার রোজা ও দান-সাদাকা কবুল করুন। আমিন।