বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্খা মুছে দেওয়ার চেষ্টায় ১৯৭১ খৃষ্টাব্দের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারপর নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
সেই রাতে ঢাকায় অর্ধ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল, সেই রাতটি ‘কালরাত্রি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অর্থাৎ হানাদার বাহিনী ১৯৭১ খৃষ্টাব্দের ২৫ মার্চ রাতের ওই সেনা অভিযানের নাম বা কোডনেম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
১৯৭১ খৃষ্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার সময় ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকাস্টের পর এটিকে বৃহত্তম গণহত্যা হিসাবে পরিণত করেছে। নারীদের বিরুদ্ধে ক্রিয়াকলাপগুলিকে পাকিস্তানের ধর্মীয় নেতারা সমর্থন করেছিলেন, তারা ঘোষণা করেছিলেন যে বাঙালি নারীরা গনিমোটার মাল বা পাবলিক প্রোপার্টির জন্য।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা চাওয়ার কারণ হল, দুই অঞ্চলের মধ্যে সংস্কৃতি, ভাষা এবং পরিচয়ের দূরত্ব এবং পার্থক্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে শক্তিশালী উত্তেজনা এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৭১ খৃষ্টাব্দের ২৫ মার্চের রাতটি ছিল ভয়াবহতম একটি রাত। মানব ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যায় সেই কালো রাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেতেছিল জান্তব উল্লাসে। ঢাকা শহর হয়েছিল ধ্বংসস্তূপ।
সুনীল চন্দ্র দাস ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের নিরাপত্তা প্রহরী। ২৫ মার্চ কালরাতে গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন তিনি। তার স্ত্রী বকুল রাণী দাস জগন্নাথ হল গণহত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী।
১৯৭১ খৃষ্টাব্দের ২৫ মার্চকে কালোরাত বলা হয়। কেননা, সে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গভীর রাতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বাংলার অগণিত মানুষকে হত্যা করে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ যে গণহত্যা চালিয়েছিল তা
ইতিহাসে এক
বর্বরোচিত অধ্যায়। সেই কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চালিয়েছিল লুটতরাজ অগ্নিসংযোগ, হত্যা ধর্ষণ…..
নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালিয়েছিল – সেই জন্য আজও পাকিস্তান ও তাদের দোসর দালালরা পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি।
তাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানকে ঘৃণা করুন – ঘৃণা করুন।
১৯৭১ –
কেমন ছিল আমার পিরোজপুর !
মিছিল – মিছিল – জনসভা –
পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন
চারিদিকে স্লোগান — জয় বাংলা,
স্বাধীন করো স্বাধীন করো বাংলাদেশ
বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলা মাকে মুক্ত করো-
সারাদেশে আন্দোলন –
স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রস্তুতি নেয়া।
৪ জানুয়ারী আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএবৃন্দ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনতার সামনে শপথ গ্রহণ করে।
২০ জানুয়ারী শহীদ আসাদ দিবস পালনের জন্য বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ওইদিন পূর্ণ দিবস হরতাল আহবান করে।
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ডাকসু নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্রলীগের নেতারা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন –
পতাকা উত্তোলন করেন ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব – সঙ্গে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন , শাহজাহান সিরাজ , রাফিয়া আক্তার ডলি, লায়লা হাসনা বানু হাসি, মমতাজ বেগম প্রমুখ।
আরও পড়ুন: জেনারেল ওসমানী : সহকারীর স্মৃতিচারণে বেরিয়ে এল কিছু অজানা তথ্য
ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে ৩ রা মার্চ দেশের সব জায়গায়
হরতাল আহবান করেন।
সেদিন পিরোজপুরেও হরতাল হয়েছিল –
মিছিল জনসভা কত কি –
এনায়েত হোসেন খানের বাসায় আলোচনা –
মোবারক মোক্তারের বৈঠকখানায়
গোপন বৈঠক –
সবার কন্ঠে ঃ স্বাধীন বাংলাদেশ চাই।
পিরোজপুরে –
ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নিতাম প্রতিদিন –
মিছিলে ওই সময় যারা নিয়মিত থাকতেন তারা হলেন –
সালাহউদ্দিন সালু , ওমর ফারুক,
মালেক খান আবু , সালাম শিকদার, নজরুল ইসলাম, মাসুদ, হায়দার, মাহবুব, অনিল, সেলিম, মাহামুদা, বেনু এবং আরও অনেকে –
মিছিলের অগ্রভাগে সবসময় ছিলাম আমি।
কত স্লোগান মিছিলে মিছিলে –
বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলের অগ্রভাগে ছিল –
দুলাল, ফজলু, চান, এন এম খালেদ রবি, চপল, রোজী এবং আরও অনেকে।
৩ রা মার্চ চট্টগ্রামে বহু লোক
সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায়। অন্যদিকে সামরিক সরকার কার্ফু জারি করে চট্টগ্রামে।
৫ মার্চ ঢাকা ও টঙ্গীতে বিক্ষুব্ধ জনতার উপর গুলিবর্ষণে শতাধিক লোক নিহত হয়।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন —
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
তখনই আমরা বুঝে নিলাম –
দেশকে স্বাধীন করতেই হবে এবং আমরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।
এরপর সারাদেশে অবিরাম ভাবে মিছিল জনসভা প্রতিবাদ চলতে লাগলো –
আমাদের সবার কন্ঠে কন্ঠে স্লোগান ঃ
পিন্ডি না ঢাকা – ঢাকা ঢাকা।
জিন্নাহ সাইবের পাকিস্তান আজিমপুরের গোরস্থান।
২৩ শে মার্চ পিরোজপুরের
আদালতের ছাদে উঠে আমি, অনিল এবং আরও কয়েকজনে মিলে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিলাম।
২৫ শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী
ঢাকা সহ সারাদেশে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র এবং পুলিশ ও
সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের হামলা করার মধ্য দিয়ে।
২৫ শে মার্চ রাত বারোটার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং এ ঘোষণা ওয়ারলেস যোগে চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন –
ওই রাতে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নান
শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন।
মূল ঘোষণা হলো ঃ
এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহবান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয়ের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।
ওই রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফয়সালাবাদের একটি জেলে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়।
২৫ শে মার্চ সারারাত ধরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায় বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় – মন্দিরে মন্দিরে –
হিন্দু বাড়িতে !
হিন্দু শিক্ষক, হিন্দু পরিবারের লোকজন ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা ছিল তাদের টার্গেট।
যাকে পেয়েছে তাকেই করেছে হত্যা – সেই রাতে। এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ভরে গিয়েছিল
লাশের স্তুপে –
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও
স্থানীয় দালালদের সারা দেশে অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে ১৯৭১ সালে –
১ কোটি অসহায় মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
আর আমাদের পিরোজপুরের ছাত্রলীগের নেতা
মালেক খান আবু ২৫ শে মার্চের সেই রাতে সারারাত ধরে মাইকিং করে ঘোষণাপত্রটি পাঠ করে শুনান –
সেই সঙ্গে জানান , পিরোজপুরবাসী উঠুন –
জাগুন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নামুন।
১০ এপ্রিল মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়।
এরও কিছু দিন পরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পিরোজপুরে এসে
এস ডি ওর বাড়িতে ঘাঁটি গাড়ে –
তারপর এদের সঙ্গে যোগ দেয় – জামাত, শিবির, মুসলিম লীগ, এন এস এফের কর্মীরা –
সাঈদী, হারুন, আলতাফ, আতাহার এ রকম বহু রাজকারের উত্থান ঘটলো – এই রাজাকার দালালরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে নিয়ে গেল বিভিন্ন অপারেশনে –
হিন্দু বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া ছিল তাদের মূল টার্গেট।
রাজারহাটে ছিল শতকরা নব্বই ভাগ হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর –
প্রতিটি গৃহস্থ পরিবারের যাকে যাকে পাওয়া গেল তাদেরকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে
নির্মমভাবে হত্যা করা হলো –
সেই ১৯৭১ সাল ছিল হিন্দু নিধন অভিযান।
স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে হত্যাযজ্ঞ চালানোর বছর।
যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কুকুরের মতো কুৎসিত রূপ নিয়ে রাস্তাঘাটে পালাক্রমে ধর্ষণ করার পরে –
যুবতী মেয়েদেরকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কি পাষবিক ভাবে হত্যা করলো –
যারা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে এ দৃশ্য দেখেছিলেন , পরবর্তীতে তাদের মুখে এই কথাগুলি শুনেছিলাম।
উপেন এতবর উকিল, ক্ষেত্রমোহন মাঝি উকিল সহ প্রতিটি হিন্দু পরিবারের বাড়ী সহ স্বাধীনতা পক্ষের সবার বাড়িঘরে প্রথম লুটপাট চালালো
জামাত, শিবির, মুসলিম লীগের কর্মীরা –
সোনা গয়না লুট করে ওরা ছালা বস্তায় ভরার পরে বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল –
যারা সে দৃশ্য দেখেছিল, তাদের মুখে পরবর্তীতে শুনেছিলাম সেই নির্মমতার বিভৎস কাহিনি –
পিরোজপুরের প্রতিটি হিন্দু পরিবারের
এবং স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে পুড়িয়েও দেয়া হয়।
সেদিনের পিরোজপুরের দৃশ্য ছিল আগুনের লেলিহান শিখার মত।
শুধু জ্বলছে আর জ্বলছে হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর –
বলেশ্বরের তীরে নিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে
দিনের পর দিন হত্যাযজ্ঞা চালিয়েছিলো হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী।
এস ডি ও বাড়িতে আর পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ক্যাম্প স্থাপন করে সুন্দরী মেয়েদের ধরে এনে পালা ক্রমে ধর্ষণ করেছে –
চালিয়েছে কত নির্যাতন –
সীমার -এজিদের চেয়েও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও স্থানীয় দালালরা ছিল নিকৃষ্টতর –
কোনো কোনো মুসলিম লীগ নেতার বাড়িতে পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনরা অতিথি হয়ে নাচ গান দেখতে –
শুনতে গিয়ে কি কি করেছিল – তা আজ পর্যন্ত অজ্ঞাত হয়ে রইলো।
চপলা, লীলারা সম্ভবত সেই বছর চির জনমের তরে পিরোজপুর ছেড়ে চলে গিয়েছিল –
কত হিন্দু পরিবার চলে গিয়ে ফিরলো না আর –
এ বেদনার কথা কাহারে বলিরে –
আমাদের সঙ্গে কত সম্প্রীতি ছিল – ছিল কত হৃদতা।
কত দিদি কত দাদা –
এই অবেলায় মনে জাগে তাহাদের কথা –
প্রাণের বন্ধু
সজল প্রদীপ মণিরঞ্জন ঘোষ
শৈলেন ওরফে সত্য স্বপন কৃপাঙ্ক
বাবুল উত্তম মৃধা কচি নিমাই শেখর
রঞ্জিত অপূর্ব পঙ্কজ কুঞ্জু শ্যামল বাণী ……..
তোমরা কোথায় আছো
কেমন আছো – জানি না – জানি না
বড্ড জানতে ইচ্ছে করে
তোমাদের সেই ভালবাসা
হৃদয়ের গভীরে বারে বারে জাগে
এ জীবনে হবে না আর কোনদিন দেখা
সেই অনুশোচনা নিয়ে দগ্ধ হয়ে জ্বলিব মরিব –
এই তো জীবন –
কোথায় চপলা – লীলা ?
একটি বারের জন্য বলো – ভালো আছি।
না হয় আবারও দিব একটি গোলাপ।
মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে আমি কখনও ছিলাম কলকাতায় –
আবার ফরিদপুরে এসে হাফিজ বাহিনীর সঙ্গে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছি।
কিছু কিছু ঘটনা ঃ
৫ ই মে – গোপালপুরে গণহত্যা হয়েছিল।
১৫ ই মে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতা শুরু।
২০ শে মে – খুলনায় চুকনগর গণহত্যা সংঘটিত হয়, সেখানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করে।
২৪ শে মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কলকাতায় কাজ শুরু করে।
সেই বেতার কেন্দ্র থেকে শুনেছি প্রিয় ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকীর ভাষণ –
শুনেছি প্রিয় কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বারের কন্ঠে –
মুজিব বাইয়া যাওরে নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাও ওরে মুজিব ;
শুনেছি – জয় বাংলা বাংলার জয ” গান
আর তখন মুক্তিযুদ্ধে আরও অনুপ্রাণিত হয়েছি।
১৬ ই আগষ্ট পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়।
১৩ ই অক্টোবর ঢাকার গেরিলা যোদ্ধারা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনায়েম খানকে হত্যা করে।
৯ ই নভেম্বর ছয়টি ছোট যুদ্ধ জাহাজের সমন্বয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম যুদ্ধবহর যাত্রা শুরু করে।
১৬ ই নভেম্বর আজমিরীগঞ্জ যুদ্ধ –
সেই যুদ্ধ মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে চলে প্রায় ১৮ ঘন্টা ধরে।
যুদ্ধে খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধা জগৎ জ্যোতি দাস শহীদ হন।
২০ শে নভেম্বর গরিবপুরের যুদ্ধ – সেই যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী জয়ী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পরাজিত হয়ে বহু এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
২১ শে নভেম্বর মিত্র বাহিনী গঠিত হয় – বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনী নিয়ে।
২২ শে নভেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত – চারিদিকে খন্ড খন্ড যুদ্ধ চলে।
৩ রা ডিসেম্বর ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়।
৬ ই ডিসেম্বর – ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদান।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বাংলাদেশ বেতার হিসেবে সম্প্রচার শুরু হয়।
সেই সময় শুনতাম – আবদুল জব্বার, হরলাল রায়, আলাউদ্দিন, আপেল মাহমুদ, অজিত রায়, স্বপ্না রায়, কল্যাণী ঘোষ সহ আরও অনেকের কন্ঠে গান।
এরপর একে একে সকল মহকুমা ও জেলা শহর একে একে স্বাধীন হয়ে গেল।
১৪ ই ডিসেম্বর ছিল – এক নির্মমতার দিন। ওই দিনে জামাত, শিবির আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এক হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বুদ্ধিজীবিদের বাছাই করে গণহত্যা করে।
১৬ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পরাজিত হয়ে মিত্র বাহিনীর প্রধান জগদিৎ সিংহ অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে —
আর আমরা স্বাধীনতা লাভ করলাম।
কিছুদিন পরে ফিরে এলাম কলকাতা থেকে —
জয় বাংলা বাংলার জয় ” গান গাইতে গাইতে।
আর হাতে ছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা।