বাংলাদেশ একটি উৎসবমুখর দেশ। এখানে ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। নতুন বছরের এই ছুটির তালিকায় শুধু ঈদ নয়, বরং অনেকগুলো জাতীয় দিবসের সাথে সাপ্তাহিক ছুটির চমৎকার এক সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। আজকের এই পোস্টে আমরা ২০২৬ সালের মোট ছুটি, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের সেই কাঙ্ক্ষিত লম্বা ছুটি এবং মাসভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার
২০২৬ সালে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে বড় ধরণের ছুটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা প্রতি বছর ঈদের অপেক্ষায় থাকি, তাদের জন্য ২০২৬ সাল হবে এক বিরল অবসরের বছর। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ (শনিবার) থেকে ২৫ মার্চ (বুধবার) পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি থাকবে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই ছুটির ঠিক আগেই ২০ মার্চ (শুক্রবার) রয়েছে জুমাতুল বিদা। এর মানে হলো সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যাবে ২০ তারিখ থেকেই।
সাধারণত ঈদের ছুটি তিন দিনের হলেও সরকার এবার নির্বাহী আদেশে তা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও পরিবার-পরিজনের সাথে অনেকটা সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন। যারা নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যান, তাদের জন্য এই ৫-৬ দিনের টানা ছুটি বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে। যাতায়াতের ঝক্কি সামলে প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানো এবার অনেক বেশি সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জুমাতুল বিদা থেকে স্বাধীনতা দিবস: টানা ছুটির অঙ্ক
মার্চ মাসের এই ছুটিটি শুধুমাত্র ঈদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যালেন্ডার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৫ মার্চ বুধবার ঈদের ছুটি শেষ হলেও তার ঠিক পরদিন ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) হচ্ছে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। যেহেতু ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি, তাই ২১ থেকে ২৫ তারিখের ছুটির সাথে এটি সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ২০ মার্চ শুক্রবার থেকে শুরু করে ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ৭ দিন পুরো দেশ ছুটির আমেজে থাকবে। নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে ঈদুল ফিতরের সেই বিশেষ দিনগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:
| তারিখ | দিন | ছুটির কারণ |
|---|---|---|
| ২০ মার্চ | শুক্রবার | জুমাতুল বিদা ও সাপ্তাহিক ছুটি |
| ২১ মার্চ – ২৫ মার্চ | শনিবার – বুধবার | পবিত্র ঈদুল ফিতর (নির্বাহী আদেশসহ) |
| ২৬ মার্চ | বৃহস্পতিবার | স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস |
| ২৭ মার্চ | শুক্রবার | সাপ্তাহিক ছুটি |
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন: ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সাধারণ ছুটি থাকবে মোট ১৪ দিন। এর বাইরে নির্বাহী আদেশে দুই ঈদের জন্য অতিরিক্ত ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার চেষ্টা করেছে যাতে করে উৎসবের সময়গুলোতে নাগরিকরা একটি নিরবচ্ছিন্ন অবসর পায়। তবে মনে রাখা জরুরি যে, ঈদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ছুটিগুলো সম্পূর্ণভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এই তারিখগুলোতে সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে, তবে ক্যালেন্ডারে উল্লিখিত এই ৫ দিনকেই বর্তমানে মূল ভিত্তি ধরা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর থেকেই পর্যটন খাতগুলোতে বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, সিলেট এবং সাজেকের মতো জায়গাগুলোতে মানুষ আগেভাগেই ভ্রমণের পরিকল্পনা সারছেন। আপনি যদি আপনার লাইফস্টাইল বা ভ্রমণ পরিকল্পনা উন্নত করতে চান, তবে এখনই হোটেলের রুম বা বাসের টিকিট বুক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি উপলক্ষে রাস্তাঘাটে অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে সরকারের এই দীর্ঘ ছুটির সিদ্ধান্ত পরিবহন খাতের ওপরও কিছুটা চাপ কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের দুই ঈদের লম্বা ছুটি ও সাধারণ ধারণা
বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছুটি হলো দুই ঈদের ছুটি। ২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম নয়। শুধু ঈদুল ফিতরই নয়, বরং ঈদুল আজহা উপলক্ষেও সরকার বড় ধরণের ছুটির পরিকল্পনা করেছে। ঈদুল আজহার ছুটি মে মাসের শেষ এবং জুন মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৮ মে (বৃহস্পতিবার) থেকে ২ জুন (মঙ্গলবার) পর্যন্ত মোট ৬ দিন নির্বাহী আদেশে এই ছুটি দেওয়া হয়েছে।
বছরের প্রথম সরকারি ছুটি পালিত হবে ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার), পবিত্র শব-ই-বরাত উপলক্ষে। এভাবে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ছোট-বড় ছুটির মাধ্যমে ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারটি বেশ গোছানো মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বেসরকারি খাতে কাজ করেন, তারা এই সরকারি ক্যালেন্ডার দেখে নিজের ছুটির আবেদন আগেভাগেই করতে পারবেন। সরকারি এই ছুটির বিন্যাস দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও পর্যটন ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
মাসভিত্তিক সরকারি ছুটির তালিকা ২০২৬
আপনার সুবিধার জন্য পুরো বছরের ছুটির তালিকা নিচে মাস অনুযায়ী সাজানো হলো। এর মাধ্যমে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কোন মাসে কয়দিন ছুটি থাকছে এবং সেই অনুযায়ী আপনার ব্যক্তিগত কাজের পরিকল্পনা করতে পারবেন।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চ ২০২৬ (উৎসবের শুরু)
- ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার): পবিত্র শব-ই-বরাত।
- ২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার): শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
- ১৭ মার্চ (মঙ্গলবার): পবিত্র শব-ই-কদর।
- ২০ মার্চ (শুক্রবার): জুমাতুল বিদা।
- ২১ মার্চ – ২৫ মার্চ (শনিবার-বুধবার): পবিত্র ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি।
- ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার): স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস।
এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬
- ১৩ এপ্রিল (সোমবার): চৈত্র সংক্রান্তি।
- ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার): বাংলা নববর্ষ।
- ১ মে (শুক্রবার): মহান মে দিবস।
- ৭ মে (বৃহস্পতিবার): বুদ্ধ পূর্ণিমা (বৈশাখী পূর্ণিমা)।
- ২৮ মে – ২ জুন (বৃহস্পতিবার-মঙ্গলবার): পবিত্র ঈদুল আজহা।
- ২৬ জুন (শুক্রবার): পবিত্র আশুরা।
| মাস | তারিখ | দিবস |
|---|---|---|
| আগস্ট | ৫ আগস্ট | জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস |
| আগস্ট | ২৬ আগস্ট | ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.) |
| সেপ্টেম্বর | ৪ সেপ্টেম্বর | শুভ জন্মাষ্টমী |
| অক্টোবর | ২১-২২ অক্টোবর | দুর্গাপূজা (নবমী ও দশমী) |
| ডিসেম্বর | ১৬ ডিসেম্বর | মহান বিজয় দিবস |
| ডিসেম্বর | ২৫ ডিসেম্বর | যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন (বড়দিন) |
নতুন সংযোজন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস
২০২৬ সালের ছুটির তালিকায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নতুন সংযোজন হলো ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। এটি ৫ আগস্ট (বুধবার) পালন করা হবে এবং এদিন সারা দেশে সাধারণ ছুটি থাকবে। দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারিভাবে এই দিবসটিকে ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এই দিনটিতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ আলোচনার আয়োজন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি এবং মে মাসের ঈদুল আজহার ছুটির পর ৫ আগস্টের এই ছুটিটি বছরের মাঝামাঝি সময়ে নাগরিকদের জন্য এক দিনের সংক্ষিপ্ত বিশ্রামের সুযোগ করে দেবে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই দিবসের মাহাত্ম্য তুলে ধরা এবং জাতীয় সংহতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ছুটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি ও টানা ৭ দিনের অবসর
মার্চ মাসের লম্বা ছুটিকে অনেকেই “সুপার উইক” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। আপনি যদি ২০ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত ছুটি হিসাব করেন, তবে দেখবেন এটি একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ। অনেকে যদি ২৭ ও ২৮ তারিখের সাপ্তাহিক ছুটিকেও এর সাথে যুক্ত করতে পারেন (বেসরকারি সেক্টরে যারা কাজ করেন), তবে প্রায় ৯ দিনের একটি মেগা ভ্যাকেশন বা বড় ছুটি উপভোগ করা সম্ভব। ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি ২০২৬ এ রকম একটি সুযোগ করে দিচ্ছে যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি সাবলীল।
তবে এই লম্বা ছুটির কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়ার সময় অতিরিক্ত ভিড়, ট্রেনের টিকিটের হাহাকার এবং বাস টার্মিনালগুলোর বিশৃঙ্খলা এড়াতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে সার্ভার জ্যাম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই সময় বুঝে সব কাজ গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন। যারা দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এখনই পাসপোর্ট রিনিউ বা ভিসার আবেদন করে রাখা ভালো হবে।
শারদীয় দুর্গাপূজার দুই দিনের ছুটি
২০২৬ সালে দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও সবার জন্য সুখবর হলো, এবার মোট দুই দিনের সরকারি ছুটি বরাদ্দ করা হয়েছে। ২১ ও ২২ অক্টোবর (বুধবার ও বৃহস্পতিবার) যথাক্রমে মহানবমী ও বিজয়া দশমী উপলক্ষে এই ছুটি থাকবে। যেহেতু এর পরপরই শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি পড়ছে, তাই পূজা উপলক্ষেও টানা ৪ দিনের একটি বড় ছুটি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি ও ভ্রমণের প্রস্তুতি
লম্বা ছুটিতে ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি যেহেতু মার্চ মাসে পড়েছে, সেই সময় আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ থাকে। না বেশি গরম, না বেশি শীত। ভ্রমণের জন্য এটি আদর্শ সময়। আপনি চাইলে সাজেক ভ্যালি বা সিলেটের চা বাগান ঘুরে আসতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে সব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকবে। তাই নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে অফ-বিট বা কম পরিচিত জায়গাগুলো বেছে নিতে পারেন।
- বাজেট পরিকল্পনা: উৎসবের সময় সব জিনিসের দাম একটু চড়া থাকে, তাই পর্যাপ্ত বাজেট হাতে রাখুন।
- বুকিং: হোটেল এবং যাতায়াতের মাধ্যম অন্তত এক মাস আগে কনফার্ম করুন।
- স্বাস্থ্য সুরক্ষা: ভ্রমণে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ফার্স্ট এইড বক্স সাথে রাখুন।
- প্যাকিং: মার্চ মাসের আবহাওয়ার সাথে মানানসই হালকা সুতির পোশাক সাথে নিন।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায় যে, ২০২৬ সালের ছুটির তালিকাটি দেশের মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে আনন্দময় করতে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি এবং এর সাথে স্বাধীনতা দিবসের সমন্বয় আমাদের একটি লম্বা ও সার্থক অবসরের সুযোগ করে দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই সুচিন্তিত সিদ্ধান্তটি দেশের মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়াতে এবং মানসিক অবসাদ দূর করতে সহায়ক হবে। আপনি এখনই এই তালিকাটি আপনার ডায়েরি বা মোবাইলে সেভ করে রাখুন এবং আগামী বছরের রঙিন দিনগুলোর জন্য প্রস্তুতি শুরু করুন। ঈদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসগুলো সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি।