রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা

পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য নেয়ামত। এই মাস শুধু দিনে উপবাস থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। সারা বিশ্বের মুসলমানরা বছরভর এই মাসের জন্য অপেক্ষায় থাকে। রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই মাস আমাদের জীবন গঠনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সিঁড়ি বেয়ে জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ সুযোগ। আসুন, আমরা এই বরকতময় মাসের ফজিলত, শিক্ষা এবং করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।

রমজানের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

রমজান মাস শুধু একটি আরবি মাসের নাম নয়; এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। এই মাসেই মানবজাতির জন্য হেদায়েত হিসেবে পবিত্র কোরআন নাজিল করা শুরু হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “রমজান মাস, এতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।” (সূরা বাকারা: ১৮৫)। তাই রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা জানার অর্থ হলো, আল্লাহর দেওয়া বিধান ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণের শিক্ষা নেওয়া।

রহমতের দরজা খুলে যায়

রমজান মাস আসলেই জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন রমজান মাস শুরু হয়, তখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।” (বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, এই মাস নেক আমলের জন্য কতটা অনুকূল। তাই আমাদের উচিত এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানো।

রমজানের শিক্ষা: আত্মশুদ্ধি ও সংযম

রমজানের মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। সারাদিন না খেয়ে থাকার নাম রোজা নয়, বরং খাদ্য, পানীয় ও যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার নাম রোজা। রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা আমাদের সংযমের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রবৃত্তির বশবর্তী না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছাকে সংযত করতে হয়।

সিয়ামের আভ্যন্তরীণ তাৎপর্য

রোজা শুধু পেট রাখার নাম নয়; চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও রোজা রাখা জরুরি। মিথ্যা কথা, গিবত, পরনিন্দা, কারও প্রতি খারাপ দৃষ্টি দেওয়া—এসব থেকে বিরত থাকা রোজার পূর্ণতা দেয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “রোজা আমারই জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব।” (বুখারি)। এটি প্রমাণ করে রোজার মর্যাদা আল্লাহর কাছে কত বেশি।

সেহরি ও ইফতারের গুরুত্ব

রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে রয়েছে অশেষ বরকত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” (বুখারি ও মুসলিম)। সেহরি খেলে সারা দিন রোজা রাখার শক্তি পাওয়া যায় এবং এটি অন্যান্য উম্মতের রোজা থেকে আমাদের রোজার পার্থক্য তৈরি করে।

অন্যদিকে, ইফতার করা ওয়াজিব নয় বরং সুন্নত। তবে ইফতার করাতে হবে। সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা মুস্তাহাব। রাসুল (সা.) কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে পানি দিয়ে। ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত।

ইফতারের দোয়া

ইফতারের সময় একটি ছোট্ট দোয়া পড়া সুন্নত। উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা ওয়া তাওয়াক্কালতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।”

তারাবিহ ও কোরআন তিলাওয়াতের ফজিলত

রমজান মাসে তারাবিহ নামাজ আদায় করা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সুন্নত। এই নামাজ রমজানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ সময় ইমাম সাহেব কোরআন খতম দেন এবং মুসল্লিরা মনোযোগ দিয়ে কোরআন শোনেন। রমজানকে বলা হয় কোরআন নাজিলের মাস, তাই এই মাসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। কোরআনের প্রতিটি অক্ষরের জন্য সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

কোরআন চর্চার মাস

হজরত জিবরাইল (আ.) প্রতি রমজানে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কোরআন শুনিয়ে দিতেন। এ থেকে বোঝা যায়, এই মাসে কোরআন তিলাওয়াত ও চর্চার কত গুরুত্ব। আমাদের উচিত এই মাসে কোরআন পড়ার পাশাপাশি তার অর্থ ও মর্ম বোঝার চেষ্টা করা। কোরআনকে শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা।

লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রজনী

রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর অবস্থিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” (সূরা আল-কদর: ৩)। এই একটি রাতে ইবাদত করা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এটি অশেষ রহমত ও বরকতের রাত।

শেষ দশকের আমল

লাইলাতুল কদর পাওয়ার জন্য রমজানের শেষ দশ দিন ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো উচিত। রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধে কাজ করতেন এবং নিজের পরিবার-পরিজনকেও জাগিয়ে দিতেন। এই সময় ইতিকাফ করা সুন্নত। ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার সব কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে মোনাজাতে মশগুল হয়ে যায়।

দান-সদকার গুরুত্ব

রমজান মাস দান-সদকার মাস। এই মাসে একটি নফল দানের সওয়াব ফরজের সমান এবং একটি ফরজ দানের সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। রাসুল (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বড় দানশীল, আর রমজান মাসে তিনি আরও বেশি দান করতেন। গরিব-দুঃখী, এতিম-মিসকিনদের প্রতি সদয় হওয়া, তাদের ইফতার করানো, সাহরি দেওয়া—এসবের সওয়াব অপরিসীম।

ফিতরা ও সদকাতুল ফিতর

রমজানের শেষে ঈদের আগে ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এটি গরিবদের জন্য এক ধরনের সহায়তা, যাতে তারাও ঈদের আনন্দে সামিল হতে পারে। ফিতরা আদায় করলে রোজার কিছু খুঁত দূর হয় এবং এটি গরিবের প্রতি সমাজের দায়িত্বও পালন করে।

রমজানের শেষ দশক ও ইতিকাফ

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ইতিকাফ অবস্থায় মানুষ মসজিদে থেকে দিন-রাত ইবাদত করে। এটি আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। রাসুল (সা.) প্রতি রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এ সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।

দোয়া মাগফিরাত

রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে করতে বিশেষ একটি দোয়া পড়া জরুরি। হজরত আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, লাইলাতুল কদর পেলে কী দোয়া পড়বেন? রাসুল (সা.) বলেছিলেন, তুমি পড়বে: “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

রমজানের পর করণীয়

রমজান শেষ হয়ে গেলেই ইবাদত শেষ হয়ে যায় না। ঈদুল ফিতর আসে পুরস্কার হিসেবে। রমজানের শিক্ষা সারা বছর ধরে বজায় রাখা জরুরি। সারা বছর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত চালু রাখা, মিথ্যা ও গিবত থেকে বেঁচে থাকা—এগুলোর অভ্যাস রমজান আমাদের শেখায়। তাই রমজান যেন আমাদের জীবন গঠনের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়।

শেষ কথা

রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, বরং তা আমল করার জন্য। রমজান আমাদের সুযোগ দেয় নতুন করে শুরু করার, গুনাহ থেকে তওবা করার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের। আসুন, আমরা এই রমজানকে স্বাগত জানাই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের আশায়। বেশি বেশি কোরআন পড়ি, নামাজ পড়ি, দান করি এবং আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়া করি। আমাদের সবাইকে আল্লাহ তাআলা রমজানের পূর্ণ ফজিলত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

প্রশ্ন-উত্তর সেকশন

রমজানে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য কী?

রমজানে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। কোরআনে বলা হয়েছে, “যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।

লাইলাতুল কদর কোন রাতে?

লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর যেকোনো একটিতে হয়ে থাকে। সাধারণত ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ তারিখের রাতে এটি তালাশ করা হয়। তবে ২৭ তারিখের রাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সেহরি খাওয়ার সময় কখন শেষ হয়?

সেহরির সময় শেষ হয় সুবহে সাদিক বা প্রকৃত ভোরের সূর্যের লাল আভা পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত। তারপরই ফজরের আজান হয় এবং রোজা শুরু হয়ে যায়।

ইফতারের দোয়াটি কী?

ইফতারের সময় পড়ার দোয়া হলো: “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।”

রমজানে কোন ইবাদতের সওয়াব সবচেয়ে বেশি?

রমজানে সব ইবাদতের সওয়াবই বেশি, তবে ফরজ নামাজের সওয়াব ৭০ গুণ বেড়ে যায় এবং নফল ইবাদতের সওয়াব ফরজের সমান হয়। কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সওয়াব অপরিসীম।