আবারও ফিরে এলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান। ২০২৬ সালের রমজান মাস শুরু হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে। সিয়াম সাধনার এই মাসে প্রতিটি মুসলমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো সাহ্রি ও ইফতার করা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সব জেলার জন্য পৃথক পৃথক সময়সূচি প্রকাশ করেছে। রমজানের সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬ জানা থাকলে রোজাদাররা নিশ্চিতভাবে তাদের দৈনন্দিন রুটিন সাজাতে পারেন। এই আর্টিকেলে আমরা ঢাকা শহরের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচির পাশাপাশি সময় নির্ধারণের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় দোয়া এবং রমজান মাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৬ সালের রমজান ক্যালেন্ডার
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিবছর সারা দেশের জন্য নির্ভুল সময়সূচি প্রণয়ন করে থাকে। ২০২৬ সালের রমজান মাসের জন্য এই সময়সূচি ইতিমধ্যে তাদের ওয়েবসাইট এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম রোজা ছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার)। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজানের শুরু নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশে সরকারিভাবে এই তারিখ ঘোষণা করা হয়। এবারের সময়সূচিতে বিশেষত্ব হলো, প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব মিলিয়ে সময় বের করার প্রয়োজনীয়তা নেই। সরাসরি নিজ নিজ জেলার তালিকা অনুসরণ করলেই চলবে।
কেন জেলাভিত্তিক আলাদা সময়সূচি?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়ে পার্থক্য দেখা যায়। দেশের পূর্ব প্রান্তে সূর্য তাড়াতাড়ি ওঠে এবং তাড়াতাড়ি অস্ত যায়। অন্যদিকে পশ্চিম প্রান্তে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অপেক্ষাকৃত দেরিতে হয়। এই কারণে সারা দেশের জন্য একই সময়সূচি ব্যবহার করলে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ব্যবধান দেখা দিতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই বিষয়টি বিবেচনা করে এবার ৬৪ জেলার জন্য ৬৪টি ভিন্ন ভিন্ন সময়সূচি প্রস্তুত করেছে। এতে করে প্রতিটি অঞ্চলের রোজাদারগণ আরও নির্ভুল সময়ে সাহ্রি ও ইফতার করতে পারবেন।
ঢাকা জেলার জন্য নির্ভুল সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি
রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলের রোজাদারদের জন্য নিচে পূর্ণাঙ্গ মাসব্যাপী সময়সূচি দেওয়া হলো। এই তালিকায় সাহ্রির শেষ সময়, ফজর শুরুর সময় এবং ইফতারের সঠিক সময় উল্লেখ করা হয়েছে। মনে রাখবেন, সাহ্রির শেষ সময় মূলত ফজরের আজান শুরুর ঠিক আগ মুহূর্ত। এই সময়ের পর কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা জায়েজ নেই।
| রোজা নং | তারিখ (২০২৬) | সাহরির শেষ সময় | ফজর শুরু | ইফতারের সময় |
|---|---|---|---|---|
| ০১ | ১৯ ফেব্রুয়ারি | ৫:১২ | ৫:১৫ | ৫:৫৮ |
| ০২ | ২০ ফেব্রুয়ারি | ৫:১১ | ৫:১৪ | ৫:৫৮ |
| ০৩ | ২১ ফেব্রুয়ারি | ৫:১১ | ৫:১৪ | ৫:৫৯ |
| ০৪ | ২২ ফেব্রুয়ারি | ৫:১০ | ৫:১৩ | ৫:৫৯ |
| ০৫ | ২৩ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৯ | ৫:১২ | ৬:০০ |
| ০৬ | ২৪ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৮ | ৫:১১ | ৬:০০ |
| ০৭ | ২৫ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৮ | ৫:১১ | ৬:০১ |
| ০৮ | ২৬ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৭ | ৫:১০ | ৬:০১ |
| ০৯ | ২৭ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৬ | ৫:০৯ | ৬:০২ |
| ১০ | ২৮ ফেব্রুয়ারি | ৫:০৫ | ৫:০৮ | ৬:০২ |
| ১১ | ০১ মার্চ | ৫:০৫ | ৫:০৮ | ৬:০৩ |
| ১২ | ০২ মার্চ | ৫:০৪ | ৫:০৭ | ৬:০৩ |
| ১৩ | ০৩ মার্চ | ৫:০৩ | ৫:০৬ | ৬:০৪ |
| ১৪ | ০৪ মার্চ | ৫:০২ | ৫:০৫ | ৬:০৪ |
| ১৫ | ০৫ মার্চ | ৫:০১ | ৫:০৪ | ৬:০৫ |
| ১৬ | ০৬ মার্চ | ৫:০০ | ৫:০৩ | ৬:০৫ |
| ১৭ | ০৭ মার্চ | ৪:৫৯ | ৫:০২ | ৬:০৬ |
| ১৮ | ০৮ মার্চ | ৪:৫৮ | ৫:০১ | ৬:০৬ |
| ১৯ | ০৯ মার্চ | ৪:৫৭ | ৫:০০ | ৬:০৭ |
| ২০ | ১০ মার্চ | ৪:৫৭ | ৪:৫৯ | ৬:০৭ |
| ২১ | ১১ মার্চ | ৪:৫৬ | ৪:৫৮ | ৬:০৭ |
| ২২ | ১২ মার্চ | ৪:৫৫ | ৪:৫৭ | ৬:০৮ |
| ২৩ | ১৩ মার্চ | ৪:৫৪ | ৪:৫৭ | ৬:০৮ |
| ২৪ | ১৪ মার্চ | ৪:৫৩ | ৪:৫৬ | ৬:০৯ |
| ২৫ | ১৫ মার্চ | ৪:৫২ | ৪:৫৫ | ৬:০৯ |
| ২৬ | ১৬ মার্চ | ৪:৫১ | ৪:৫৪ | ৬:১০ |
| ২৭ | ১৭ মার্চ | ৪:৫০ | ৪:৫৩ | ৬:১০ |
| ২৮ | ১৮ মার্চ | ৪:৪৯ | ৪:৫২ | ৬:১০ |
| ২৯ | ১৯ মার্চ | ৪:৪৮ | ৪:৫০ | ৬:১১ |
| ৩০ | ২০ মার্চ | ৪:৪৭ | ৪:৪৯ | ৬:১১ |
সময়সূচি ব্যবহারে সতর্কতা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, সময়সূচিতে লিখিত সাহ্রির শেষ সময় মূলত ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরুর সময়। তবে জেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব অনুপাতে সময়ের ব্যবধান হয়ে থাকে। তাই জেলার ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাহ্রির সময় জেলার পূর্ব প্রান্ত এবং ফজরের আজানের সময়টি জেলার পশ্চিম প্রান্তের সময় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ইফতারের জন্য জেলার পশ্চিম প্রান্তের সময় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই নিজ নিজ এলাকার স্থানীয় সময়ের সাথেও এই তালিকার সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আমল ও দোয়া
শুধু সময়সূচি জানাই যথেষ্ট নয়, এই মাসকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে সেটাই মুখ্য। রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস। তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা, নফল নামাজ পড়া এবং দান-খয়রাত করার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
রোজার নিয়ত ও ইফতারের দোয়া
রোজার শুরু ও শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট দোয়া রয়েছে। অনেকে নিয়ত মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে করলেও হয়। তবে ইফতারের সময় দোয়া পড়া সুন্নত।
- রোজার নিয়ত: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমজা-না মিনাল ফাজরি ইলাল মাগরিবি, খা-লিসান লিল্লাহি তা’আ-লা। অর্থ: আমি আগামীকাল রমজানের রোজা রাখার নিয়ত করলাম ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তায়ালার জন্য।
- ইফতারের দোয়া: আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া বিক্বা আামানতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু ওয়া আলা রিজক্বিকা ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি, তোমারই ওপর ঈমান এনেছি, তোমারই ওপর ভরসা করেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দ্বারাই ইফতার করছি।
সাহ্রি ও ইফতারে করণীয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহ্রি খাওয়াকে বরকতময় বলেছেন। দেরিতে সাহ্রি খাওয়া এবং তা অল্প হলেও খাওয়া সুন্নত। অন্যদিকে ইফতার দেরি না করে সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করা উচিত। খেজুর দিয়ে ইফতার করা সবচেয়ে উত্তম। খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করাও সুন্নত।
চাঁদ দেখা ও রমজানের শুরু
রমজানের চাঁদ দেখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে চোখে দেখে এবং মেঘলা থাকলে হিসাব ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চাঁদ দেখা যায়। রমজানের চাঁদ দেখার পর একটি বিশেষ দোয়া পড়া সুন্নত। চাঁদ দেখার সময় এই দোয়া পড়া উচিত।
আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল ইমানি ওয়াল ইসলামি ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম। রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ। অর্থ: হে আল্লাহ! এই চাঁদ আমাদের ওপর ঈমান, ইসলাম, নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে উদয় করুন। (হে চাঁদ!) আমার ও তোমার পালনকর্তা আল্লাহ।
বিভাগভিত্তিক সময়সূচি কোথায় পাবেন?
ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য বিভাগের জন্য আলাদা সময়সূচি প্রকাশ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলোর জন্যও নির্ভুল সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই সময়সূচিগুলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং তাদের প্রকাশিত পোস্টার ও পুস্তিকা থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে। অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতেও নিয়মিত এই সময়সূচি প্রচার করা হয়। নিজ নিজ জেলার নাম গুগলে সার্চ করলে দ্রুত সময়সূচি পাওয়া যায়।
সময় নির্ধারণে বিজ্ঞান ও শরিয়তের সমন্বয়
বর্তমান সময়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নির্ধারণে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও কম্পিউটার নির্ভর হিসাব ব্যবহার করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম ও বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরি করে। তারা কুরআন, সুন্নাহ ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এই সময়সূচি প্রণয়ন করেন। ফলে এই সময়সূচি ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নির্ভুল এবং অনুসরণযোগ্য।
শেষ কথা
রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিরাট নেয়ামত। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত ও তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। রমজানের সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬ মেনে চলার মাধ্যমে আমরা আমাদের রোজা ও ইবাদতকে আরও নির্ভুল ও সুন্দর করে তুলতে পারি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত নির্ভুল সময়সূচি আমাদের এ ব্যাপারে সহায়তা করবে। পাশাপাশি রোজার নিয়মকানুন, দোয়া ও আমল সম্পর্কে জানা এবং মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য। আসুন, আমরা সবাই এই রমজান মাসকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি।